ইসলাম কি বলে ?? ইউটিউবের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কি হালাল ??

প্রশ্ন : ইউটিউবে ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে টাকা আয় করা যাবে কি?

জবাব : প্রথমে জানতে হবে, ইউটিউব এ ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে যে টাকা আয় করা হয় তার সোর্স কী, কেন আমাকে গুগল টাকা দিচ্ছে!

গুগলের একটি বিশেষ সার্ভিস–গুগল এডসেন্স। এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন কম্পানির বিজ্ঞাপন অর্থের বিনিময়ে ইউটিউবসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সম্প্রচার করে। আর ওখান থেকে একটা নির্ধারিত একটা অংশ তারা ইউটিউবারদের দিয়ে থাকে। সুতরাং বিজ্ঞাপনগুলো যদি অশ্লীল ও হারাম পণ্যের হয়, তাহলে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ হালাল হবে না। বরং, হারাম অর্থ হওয়ার পাশাপাশি হারামের প্রচার ও সহযোগিতা করার গোনাহ হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। (সুর নূর, আয়াত : ১৯)

পক্ষান্তরে ‘এডসেন্স’ এ সেনসিটিভ অপশন বন্ধ করার অপশন আছে। যদি কেউ সেটা বন্ধ রেখে অনৈসলামিক-বিজ্ঞাপনগুলো উপেক্ষা করা যায়, তাহলে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ হালাল হবে।

উত্তর দিয়েছেন : মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী নকশবন্দী

স্ত্রী চুড়ি ও নাকফুল না পরলে স্বামীর আয়ু কমে যায় ? ইসলাম কি বলে !! জেনে নিন !!

আমাদের সমাজে অনেক বিবাহিতা মহিলাকেই শুনতে হয় যে হাতে চুড়ি না পরলে বা নাকে নাকফুল না পরলে স্বামীর আয়ু কমে যায় বা স্বামীর অমঙ্গল হয়। ঠিক যে বিশ্বাস নিয়ে বিধর্মী মহিলারা শাঁখা-সিঁদুর পরে, আজও অনেক মুসলমান মা বোন সেই একই ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী হয়ে চুড়ি-নাকফুল পরেন। প্রত্যেকের আয়ু ও ভাগ্য গর্ভে থাকতেই নির্ধারিত হয়ে যায়। কোন অলংকার এই অমোঘ বিধানকে পরিবর্তন করতে পারে না। স্বামীর জন্য নিজেকে সাজাতে অলংকারের ব্যবহার করুন, শিরকে নয়।

“তুমি বল, আমি আমার নিজের ক্ষতি কিংবা লাভেরও মালিক নই, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন।..” [সূরা ইউনুসঃ ৪৯]”

পরিবারের কল্যাণ কামনায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন ●|●

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

‘রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়া-জিনা ওয়া যুররিয়াতিনা ওয়া ক্বুররতা আ’ইউনিওয়াজ ‘আলনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমা-মা।’

অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্বামী/স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর। (সূরা ফুরক্বানঃ৭৪)

আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মানুষের হায়াত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। সে সময়ের পূর্বে বা পরে কারো মৃত্যু হবে না। তাই ঐ সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা পরিত্যাগ করা অপরিহার্য।

ভ্রু প্লাক করা কি গুনাহ ?? জেনে নিন ইসলাম কি বলে !!

জ্বী, ইসলামী শরীয়তে ভ্রু প্লাক করা গুনাহ। ভ্রু প্লাক করা ইসলামে জায়েজ না। এমনকি স্বামী চাইলেও তা জায়েজ হবে না।

হাদিসে আছে- যে নিজের ধারণায় সৌন্দর্য চর্চা করতে গিয়ে পূর্ণ ভ্রু বা আংশিক ভ্রু ফেলে দেয় আর যে এ কাজ করে তাকে রাসূল [সা] অভিসম্পাত করেছেন। [সুনানে নাসায়ি]

চেঁছে অথবা ছেঁটে অথবা লোম নাশক দ্রব্য ব্যবহার করে ভ্রুর পশম সম্পূর্ণ বা আংশিক দূর করা মুসলিম নারীর জন্য হারাম ।

হাদিসে আছে- যে নিজের ধারণায় সৌন্দর্য চর্চা করতে গিয়ে পূর্ণ ভ্রু বা আংশিক ভ্রু ফেলে দেয় আর যে এ কাজ করে তাকে রাসূল [সা] অভিসম্পাত করেছেন। [সুনানে নাসায়ি]

এটা আসলে সৃষ্টিকে এক ধরনের বিকৃত করা । শয়তান বনী আদমকে দিয়ে এ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করার প্রতিজ্ঞা করে এসেছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (শয়তান বলেছে) আমরা অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ করব, যেন তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। [সূরা আন-নিসা, আয়াত, ১১৯]

ভ্রূ চিকন করা বৈধ নয়। স্বামী চাইলেও তা করা জায়েয হবে না। কেননা হাদীস শরীফে এ জাতীয় মহিলাদের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে। কারণ রসূলুল্লাহ (সাঃ) সেই নারীকে অভিসম্পাত করেছেন যে এরূপ করে থাকে। [সহীহ বুখারী হাদীস : ৫৫৩৯; সহীহ মুসলিম হাদীস : ৫৫২৯; তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ৪/১৯৫; ফাতহুল বারী ১০/৩৯০; আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩৭৩; আলবাহরুর রায়েক ৮/২০৫; হাশিয়া তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৮৬]

মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গের বেচাকেনা কি ঠিক ?? ইসলাম কি বলে !!

ইসলামী শরীয়ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানব অস্তিত্ব ও তার অঙ্গকে মূল্যযোগ্য সম্পদ হিসাবেও স্বীকার করেছে। যেমন, যদি কোনো মানুষকে হত্যা করা হয় অথবা তার কোনো অঙ্গ ধ্বংস করা হয় তাহলে তখন তার বিনিময়ে প্রদেয় অর্থকে শরীয়তের ভাষায় রক্তমূল্য বলা হয়। তবে এ বিষয়ে সকলেই একমত, কোনো স্বাধীন মানুষের পুরো অস্তিত্বের বেচাকেনা জায়েজ নেই। আর অতীতকালে মানুষের সৌন্দর্য রক্ষার জন্যে তো চুলের ব্যবহার ব্যাপকতর ছিল। তাই আমাদের ফকীহগণ চুলের বেচাকেনাকে নিষেধ করেছেন। আর এর কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, এতে করে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। (আল বাহরুর রায়েক)।

আল্লামা শামী (রহ.) চুলের সঙ্গে মানুষের নখেরও কেনা-বেচাকে নিষেধ করেছেন। (রদ্দল মুহতার) তবে দুধের বিষয়ে ফকীহগণের মতভিন্নতা রয়েছে। হানাফি ফকীহগণ মানবীয় মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে দুধের বেচাকেনাকেও নিষেধ করেছেন (আল বাহরুর রায়েক) অবশ্য ইমাম শাফঈ (রহ.) -এর দৃষ্টিতে প্রয়োজন অনুপাতে দুধের কেচাবেচাকে জায়েজ বলেছেন।

আমরা ইবনে কুদামা (রহ.) -এর ব্যাখ্যার আলোকেই বলা যায় কিছু শর্ত মেনে মানুষের অঙ্গ কেচাবেচা জায়েজ হবে। কেননা মূল কথা হলো- ১.বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসা-বিজ্ঞান মানুষের জন্য মর্যাদার হানিকর নয়। ২. সুতরাং কারও দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা বা এ জাতীয় কোনো উপকারার্থে কিংবা কারও জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে কাউকে অঙ্গ দান জায়েজ। শর্ত হলো- অঙ্গদানের দ্বারা অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠবে এমন প্রবল ধারণা থাকতে হবে। আর তা হতে হবে কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতামত অনুযায়ী।

কোনো মৃত ব্যক্তির অঙ্গ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে শর্ত হলো- সেই তার শরীরের মালিক। অধিকন্তু তার ওয়ারিশদেরও এ বিষয়ে রাজি থাকতে হবে। কোনো জীবিত ব্যক্তির অঙ্গ গ্রহণের জন্য স্বয়ং তার অনুমতি লাগবে। তা ছাড়া সে অঙ্গ দিয়ে যেন বড় কোন ক্ষতির মধ্যে না পড়ে সে বিষয়ের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে। শাফঈ ও হাম্বলি আলেমগণের মতে, মানব অঙ্গের বেচাকেনা উভয়টিই জায়েজ। তবে হানাফি আলেমগণের মতে একান্ত অনুনোপ্যায় হয়ে পড়লে শুধু কেনা জায়েজ আছে, কিন্তু বেচা জায়েজ নেই। (জাদিদ ফিকহি মাসাইল)।

পবিত্র কোরআন শরীফ স্পর্শ করে কসম করা কি জায়েজ …?? ইসলাম কি বলে …।।

নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, পরিবার, সমাজসহ জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামবিষয়ক প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান ‘আপনার জিজ্ঞাসা’। জয়নুল আবেদীন আজাদের উপস্থাপনায় বেসরকারি একটি টেলিভিশনের জনপ্রিয় এ অনুষ্ঠানে দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিশিষ্ট আলেম ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ।

প্রশ্ন: কোরআনকে স্পর্শ করে কসম করার বিধান আছে কি?

উত্তর: না, কোরআনে কারিমকে স্পর্শ করে কসম করার বিধান নেই। কসম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নামে হয়। কিন্তু কোরআনকে স্পর্শ করে যদি কেউ কসম করে যেহেতু আল্লাহর কালাম, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কথা, তাই এটিও একধরনের কসম। অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম এ কথা বলেছেন যে, কসমের হুকুমের মধ্যে আসবে। তাই এই কসম যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে সেই ব্যক্তিকে অবশ্যই সেই কসমটি পূরণ করতে হবে। এটি বিধান নয় কিন্তু কসম করলে সেটি পূরণ করতে হবে, ভঙ্গ করা যাবে না। কারণ এটি আল্লাহর কালাম।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কালাম হওয়ার কারণে কোরআনের মর্যাদা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ করা সুযোগ নেই। আল্লাহর নামে কসম করলে যেমন তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা জায়েজ নেই তেমনিভাবে কোরআন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কালাম হওয়ার কারণে এর মর্যাদা কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ করা জায়েজ নেই। তাই এটি কসমের হুকুমের মধ্যে আসবে, তিনি কসমটি ভঙ্গ করতে পারবেন না, তিনি কসম রক্ষা করবেন।

প্রত্যেক মুসলিমের জেনে রাখা উচিৎ ..১৬ টি কুফরি বাক্য যা আমরা নিয়মিত বলে থাকি…!!

না জেনে বুঝে সমাজে কিছু প্রচলিত বাক্য আমরা প্রায়ই বলে ফেলি।

১৬ টি কুফরি বাক্য যা আমরা নিয়মিত বলে থাকি, জেনে রাখা উচিৎ প্রত্যেক মুসলিমের!

জেনে নিন সেগুলো …

১. আল্লাহর সাথে হিল্লাও লাগে।

২. তোর মুখে ফুল চন্দন পড়ুক।

( ফুল চন্দন হিন্দুদের পুজা করার সামগ্রী)

৩. কস্ট করলে কেস্ট মেলে

( কেস্ট হিন্দু দেবির নাম, তাকে পাবার জণ্য কস্ট করছেন?)

৪. মহভারত কি অশুদ্ধ হয়ে গেল?

( মহাভারত একটি উপন্যাস, যা সবসময় অশুদ্ধ)

৫. মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।

( এটি ইসলামের নামে কটূক্তি করা)

৬. লক্ষী ছেলে, লক্ষী মেয়ে, লক্ষী স্ত্রী বলা।

( হিন্দুদের দেব-দেবির নাম লক্ষী তাই ইসলামে এটি হারাম)

৭. কোন ঔষধকে জীবন রক্ষকারী বলা।

( জন্ম- মৃত্য

একমাত্র আল্লাহর হাতে)

৮. দুনিয়াতে কাউকে শাহেনসা বলা।

৯. নির্মল চরিত্র বোঝাতে ধোয়া তুলশি পাতা বলা।
( এটি অনইসলামিক পরিভাষা যা হারাম)

১০. ইয়া খাজাবাবা, ইয়া গাঊস, ইয়া কুতুব ইত্যাদি বলা।

( এটি শির্ক, ইসলামের সবচেয়ে বড় পাপ)

১১. ইয়া আলি, ইয়া রাসুল (সাঃ) বলে ডাকা এবং সাহায্য প্রার্থনা করা (আল্লাহ ছাড়া পৃথীবির কাউকে ডাকা শির্ক)

১২. বিসমিল্লায় গলদ বলা।

( এটি সরাসরি কুফরি)

১৩. মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়া বলা।

( কুফরি বাক্য, সাবধান। )

১৪. মধ্যযুগি বর্বরতা বলা।

( মধ্যযুগ ইসলামের সর্ণযুগ)

১৫. মন ঠিক থাকলে পর্দা লাগে না।

( ইসলাম ধংসকারী মতবাদ)

১৬. নামাজ না পড়লে ঈমান ঠিক আছে বলা।

( ইসলাম থেকে বের করার মূলনিতী। )

এই গুলি অজ্ঞতার কারনে হয়ে থাকে। হে মুসলিম উম্মাহ আসুন আমরা নিজে অতপর নিজের পরিবারকে সচেতন করি, তাদের মাঝে এই গুলি প্রচার করি, আর কত দিন এই অজ্ঞতায় পড়ে থাকবো?

আসুন না একজন আরেকজন কে সচেতন করার জন্য উৎসাহ দেই,

এই বাক্য গুলি আপনি যে কোন ভাবে প্রচার করুন।

ইসলাম কি বলে…’মৃত্য ব্যক্তির নামে কোরআন খতম-চল্লিশা’- কি ঠিক…?? জেনে নিন বিস্তারিত

আমাদের সমাজে একটা রীতি প্রচলিত রয়েছে সেটা হলো- কোন ব্যক্তি যদি মারা যায়, তাহরের মারা যাওয়ার সাত দিনের পর অথবা মারা যাওয়ার পর প্রথম শুক্রবার আল কোরআনের হাফেজদের ডেকে কোরআন খতম করানো। এছাড়া মৃত্যুর চল্লিশ দিনের মাথায় বিশাল মজলিশের মাধ্যমে মেজবানের আয়োজন করা হয়। ইসলামে মূলত এগুলো জায়েজ আছে কিনা জানতে হলে নিচের বর্ণনাটি পড়ুন।

মেজবান বলতে বোঝায় মানুষকে খাওয়ানো। লোকদের খাওয়ানো একটি ভালো কাজ। বুখারি শরিফের মধ্যে রাসুল (সা.) বলেছেন, এটি একটি আফতারুল ইসলাম, ইসলামের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ। সুতরাং আপনি লোকদের খাওয়াইতে পারেন; কিন্তু সেখানে আনুষ্ঠানিকতা চার দিনে, ১০ দিনে, চল্লিশা ইত্যাদি করেন তাহলে আপনি সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ করলেন।
সে ক্ষেত্রে সওয়াব তো দূরের কথা, বেদাত হওয়ার কারণে আপনি বড় ধরনের কবিরা গুনাহর মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেলেন। সুতরাং এ ধরনের কাজ করবেন না, তাহলে আমলও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক হাদিস দ্বারা এই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই মেজবান বা চল্লিশা এ জাতীয় নাম না দিয়ে আপনি যেকোনো দিন আপনার সুবিধামতো আত্মীয়স্বজন বা গরিবদের খাওয়াতে পারেন, মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করতে পারেন।
এরপর কোরআন খতম আপনি নিজে করবেন। কোরআন খতম করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন। মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন খতম করার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.) অথবা সাহাবিদের আমল দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি। এটাও আমরা নিজেরাই আবিষ্কার করে নিয়েছি।
মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন খতম না করে কোরআন খতম আমরা নিজেরাই করব, তারপর আমরা লোকদের মেজবান খাওয়াব। আমরা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-খয়রাত করব, ছদকায়ে জারিয়া করব। আর বেশি বেশি করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করব। এটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমানো বা বসা কি ঠিক ?? ইসলাম কী বলে…!!

আমাদের দেশে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে বসা, শোয়া বা ঘুমানোর ব্যাপারে বিতর্ক দেখা ও শোনা যায়। অনেকে এটিকে গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করেন আবার কেউ কেউ এতে কোনো অন্যায় দেখেন না। অনেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন কুসংস্কারেও বিশ্বাস করেন। যেমন-পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমালে হায়াত কমে যায় বলে ধারণা প্রচলিত রয়েছে।

ইসলামে কোনো বিষয়কে হালাল বা হারাম সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্যে তার পক্ষে বা বিপক্ষে গ্রহণযোগ্য দলিল থাকা জরুরি। দলিল ছাড়া ইসলামে কোনো কিছু হালাল বা হারাম বলা যায়।

তাই প্রথমে এ বিষয়টি জায়েজ কিনা তা জানতে হলে খুঁজতে হবে-এ নিয়ে কোনো দলির আচে কিনা। ইসলামী আইনের মূলনীতি হলো, ‘সাধারণভাবে সবকিছু জায়েজ, যতক্ষণ না সেটি হারাম হওয়ার পক্ষে কোনো দলিল পাওয়া যায়।’

এই মূলনীতি অনুয়ায়ী আমরা যদি এ মাসআলাটি বিশ্লেষণ করি, তাহলে বুঝা যায়, পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমানোর ব্যাপারে কোনো আদেশ বা নিষেধ নেই। কেউ যদি বলে এটি হারাম তাহলে এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য দলিল দেখাতে হবে।

আমরা ‘পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমানো নিষেধ’ মর্মে কোনো বক্তব্য কোরআন, হাদিস বা ইমামদের বক্তব্য পাইনি। তাই এটি নিষেধ করার কোনো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ নেই বলে দাবি করা যায়

অনেকে পশ্চিম দিকে (কিবলার দিকে) মুখ ফিরিয়ে বা পিঠ ফিরিয়ে পায়খানা-প্রস্রাব করার নিষেধাজ্ঞায় বর্ণিত হাদিসের ওপর কিয়াস করে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমানো বা বসাকে নাজায়েজ বলে থাকেন।

অথচ এমন ধারণার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। খোলা স্থানে কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বা পিঠ ফিরিয়ে পায়খানা-প্রস্রাব করা নিষেধ- এ সংক্রান্ত স্পষ্ট হাদিস রয়েছে (সুনান আন-নাসাঈ, হাদীস নং-২১, জামি আত-তিরমিযী, হাদীস নং-০৮)।

কিন্তু কিবলার দিকে পা দিয়ে ঘুমানো বা বসা নিষেধ-মর্মে কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। তাই কিবলার দিকে তথা পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমানো বা বসা নাজায়েজ- এ কথাটিও অপ্রমাণিত এবং ভুল।

এক প্রশ্নের উত্তরে সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাজ (র.) বলেন, ‘এতে কোনো সমস্যা নেই। কোনো ব্যক্তি যদি তার দুই পা কিবলার দিকে ফিরিয়ে রাখে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এমনকি কেউ যদি মসজিদে হারামে বসেও কাবার দিকে পা ফিরিয়ে রাখে তাতেও কোনো সমস্যা নেই।’

আর শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উছাইমীনও (র.) বলেন, ‘কিবলার দিকে পা দিয়ে ঘুমাতে বা বসতে কোনো দোষ নেই।’
তবে কিবলা ও কাবা অত্যন্ত মর্যাদাবান দু’টি বিষয়। এগুলো ইসলামের শিআর বা নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোকে কোনোভাবে অসম্মান করা, অবজ্ঞা করা বা এগুলোর প্রতি কোনো অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা মহা অন্যায়।

তাই কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে রাখে তাহলে তা মহা অন্যায় ও কবীরা গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে তা হবে কী হবে না-তা নির্ভর করে যে পা রাখছে তার ইনটেনশন বা নিয়তের উপর।

এক প্রশ্ন আসতে পারে যে, পশ্চিম দিকে পা রাখা যদি হারাম হয় তাহলে বিছানায় বা সমান কোনো স্থানে বসা কোনো মাজুর ব্যক্তি (অসুস্থতা বা কোনো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি) কীভাবে বা কোন দিকে পা রেখে সালাত আদায় করবে?
উত্তর হবে অবশ্যই পশ্চিম দিকে অর্থাৎ কিবলার দিকে পা রেখেই তিনি সলাত আদায় করবেন।

ফিকহবিশারদরা বলেন, ‘যদি কোনো অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বা বসে নামাজ পড়তে না পারেন, তাহলে কিবলার দিকে মুখ করে এক পাশে শুয়ে নামাজ আদায় করবেন। যদি সেটাও না পারেন তাহলে চিত হয়ে শুয়ে কিবলার দিকে পা দিয়ে নামাজ পড়বেন।’

এ দিক দিয়ে বলা যায়, যদি পশ্চিম দিকে পা রাখা হারাম বা নাজায়েজ হতো তাহলে সালাত আদায় কালেও তা হারাম হতো। এছাড়া তা ফিকহের কিতাবেও ফতোয়ায় উল্লেখ থাকতো।

সুতরাং বলা যায়, কিবলার দিকে বা পশ্চিম দিকে পা রেখে ঘুমালে হায়াত কমে যায় বা এ ধরনের কোনো কথা কোরআন ও হাদিসে নেই। তাই এগুলো বিশ্বাস করাও জায়েজ নয়।

বরং ইসলামের নামে প্রচলিত এ রকম বহু অপ্রমাণিত ও অগ্রহণযোগ্য কথা বিশ্বাস, প্রচার ও প্রসার থেকে নিজে বিরত থাকা ও অপরকে বিরত রাখার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। এটি বিশ্বাস করাও ভিত্তিহীন।

কি নিয়মে পর্দা করবেন ?? জেনে নিন ইসলাম কি বলে ।

অনেকে মনে করেন, পর্দা-বিধান শুধু নারীর জন্য। এ ধারণা ঠিক নয়। পুরুষের জন্যও পর্দা অপরিহার্য। তবে উভয়ের পর্দার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যে শ্রেণীর জন্য যে পর্দা উপযোগী তাকে সেভাবে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যে কোনো ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিই কুরআন-সুন্নাহর পর্দা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে এই বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, ইসলামে পর্দার বিধানটি অন্যান্য হিকমতের পাশাপাশি নারীর সম্মান ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই দেওয়া হয়েছে। এজন্য এই বিধানের কারণে প্রত্যেককে ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কৃতঘ্ন হয়ে এ বিধান সম্পর্কে অযথা আপত্তি করা উচিত নয়।

আকবর এলাহাবাদী বলেন-

প্রাশ্চাত্যের ও প্রাশ্চাত্য প্রভাবিত পুরুষদের অন্তরে পর্দা পড়ে যাওয়ার কারণে তারা এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে না পারলেও আজকের পশ্চিমা নারীরা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। আর এই বিধানটিই তাদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মাধ্যম হয়েছে।’

আমি পূর্বেই বলেছি, নারী-পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায় হল ইসলামের পর্দা বা হিজাব বিধান। এই বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই হৃদয়-মনের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব। পর্দার এই সুফল স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন।

ইরশাদ হয়েছে-

ذلكم اطهر لقلوبكم وقلوبهن

এই বিধান তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)

সুতরাং মানবসমাজকে পবিত্র ও পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে পর্দা-বিধানের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে বর্তমান সমাজের যুবক ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও নারীজাতির নিরাপত্তার জন্য পর্দা-বিধানের পূর্ণ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি।

পর্দা-বিধান কুরআন মজীদে

পর্দার বিধানটি ইসলামের একটি অকাট্য বিধান। কুরআন মজীদের অনেকগুলো আয়াতে এই বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো ঈমানদারের পক্ষে এই বিধানকে হালকা মনে করার সুযোগ নেই। এখানে কয়েকটি আয়াত সংক্ষিপ্ত আলোচনাসহ তুলে ধরা হল।

এক.

يا ايها النبى قل لازواجك وبناتك ونساء المؤمنين …

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আহযাব : ৫৯)

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরকে আদেশ করেছেন যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তখন যেন মাথার উপর থেকে ওড়না/চাদর টেনে স্বীয় মুখমন্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে।-ফাতহুল বারী ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪

ইবনে সীরিন বলেন, আমি (বিখ্যাত তাবেয়ী) আবীদা (সালমানী রাহ.)কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, কাপড় দ্বারা মাথা ও চেহারা আবৃত করবে এবং এক চোখ খোলা রাখবে।

দুই.

واذا سألتموهن فسئلوهن من وراء حجاب …

তোমরা তাঁদের (নবী পত্নীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। তোমাদের কারো জন্য আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নয় এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনো বৈধ নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)

এই আয়াত থেকেও বোঝা যায়, নারীর দেহের কোনো অংশই পর্দা-বিধানের বাইরে নয়। উম্মুল মুমিনীনগণের আমলও তা প্রমাণ করে।

এই আয়াতে যখন পর্দার বিধানকে সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মুল মুমিনীনদের জন্যও অধিকতর পবিত্রতার উপায় বলা হয়েছে তখন উম্মতের আর কে আছে যে এই বিধানের বাইরে থাকতে পারে?

তিন.

قل للمؤمنت يغضنن من ابصارهن ويحفظن فروجهن ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها

তরজমা : (হে নবী!) মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া নিজেদের আবরণ প্রদর্শন না করে। (সূরা নূর : ৩১)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, ‘সাধারণত যা প্রকাশিত’ অর্থ হচ্ছে কাপড়।-তাফসীরে তাবারী ১৮/১১৯

এই ব্যাখ্যা অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর মুখমন্ডলসহ পূর্ণ দেহ আবৃত রাখা অপরিহার্য।

চার.

وليضربن بخمرهن على جيوبهن

তরজমা : তারা যেন গ্রীবা ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। … (সূরা নূর : ৩১)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন,

يرحم الله نساء المهاجرات الأول، لما أنزل الله : وليضربن بخمرهن على جيوبهن شققن مورطهن فاختمرن بها.

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রথম শ্রেণীর মুহাজির নারীদের প্রতি দয়া করুন।

আল্লাহ তাআলা যখন

وليضربن بخمرهن على جيوبهن

আয়াত নাযিল করলেন তখন তারা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করেছিলেন।-সহীহ বুখারী ২/৭০০

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-‘ফাখতামারনা’ অর্থ তারা মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।-ফাতহুল বারী ৮/৩৪৭

আল্লামা আইনী রাহ. বলেন-‘ফাখতামারনা বিহা’ অর্থাৎ যে চাদর তারা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন তা দিয়ে নিজেদের মুখমন্ডল আবৃত করলেন। (উমদাতুল কারী ১৯/৯২)

আল্লামা শানকীতী রাহ. বলেন, এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, উপরোক্ত মহিলা সাহাবীগণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মুখমন্ডল আবৃত করারও আদেশ করেছেন। তাই তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনার্থে নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।

পাঁচ.

ولا يضربن بارجلهن ليعلم ما يخفين من زينتهن وتوبوا الى الله جميعا ايه المؤمنون لعلهم تفلحون

(তরজমা) তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা নূর : ৩১)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা ঈমানদার নারীর কর্তব্য। কারণ পরপুরুষকে নুপুরের আওয়াজ শোনানোর উদ্দেশ্যে সজোরে পদবিক্ষেপ যখন নিষেধ করা হয়েছে তখন যে সকল কাজ, ভঙ্গি ও আচরণ এর চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে তা নিষিদ্ধ হওয়া তো সহজেই বোঝা যায়। মুসলিম নারীদের জন্য এটি আল্লাহ রাববুল আলামীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পর্দার বিধান হাদীস শরীফে

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

নারী হল সতর তথা আবৃত থাকার বস্ত্ত। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে বের হয় তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে।-আলমুজামুল আওসাত, তবারানী

এই হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।

২. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।

(সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮)

কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী বলেন, নারীর জন্য বোরকা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরয। তবে হজ্বের সময়টুকু এর ব্যতিক্রম। কেননা, এই সময় তারা ওড়নাটা চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিবে, চেহারার সাথে মিলিয়ে রাখবে না। পরপুরুষ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে এবং পুরুষরাও তাদের থেকে দূরে থাকবে। (আরিযাতুল আহওয়াযী ৪/৫৬)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত কাপড় ঝুলিয়ে রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না। তখন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে মহিলারা তাদের কাপড়ের ঝুল কীভাবে রাখবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে। উম্মে সালামা বললেন, এতে তো তাদের পা অনাবৃত থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়।

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪১১৭; জামে তিরমিযী ৪/২২৩; সুনানে নাসাঈ ৮/২০৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ১১/৮২

ইমাম তিরমিযী বলেন, এই হাদীসে নারীর জন্য কাপড় ঝুলিয়ে রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটিই তাদের জন্য অধিক আবৃতকারী।

৪. ওকবা ইবনে আমের জুহানী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-তোমরা নারীদের নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনসারী সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললে, সে তো মৃত্যু।

-সহীহ বুখারী ৯/২৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১৭২; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৯, ১৫৩

এই হাদীসে বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত অবস্থানকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে স্বামী পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজন যেমন দেবর-ভাসুর ইত্যাদির সাথে অধিক সাবধানতা অবলম্বনকে অপরিহার্য করা হয়েছে।

৫. হযরত আয়েশা রা. ইফ্কের দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন-আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম একসময় আমার চোখ দুটি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে আগমনকারী। সে যখন আমার অবস্থানস্থলের নিকট পৌছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি।

-সহীহ বুখারী ৫/৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৭০; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩১৭৯

৬. উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা রা.ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না?! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?

-সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদীস : ৪১১২; জামে তিরমিযী ৫/১০২, হাদীস : ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববী ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮

৭. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সামনাসামনি চলে আসত তখন আমাদের সকলেই চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার তা সরিয়ে নিতাম।

-মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২৯৩৫

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক।

৮. আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত করে রাখতাম। …

-মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সাহাবা-যুগের সাধারণ মহিলারাও গায়র মাহরাম পুরুষ থেকে নিজেদের চেহারা আবৃত করতেন। কারণ আসমা বিনতে আবি বকর রা. এখানে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে উম্মুল মুমিনগণ ছাড়া অন্য নারীরাও তাদের মুখমন্ডল আবৃত রাখতেন।

৯. ফাতিমা বিনতে মুনযির রাহ. বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম।-মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাত করে তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।-জামে তিরমিযী

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, একজন মহিলা পর্দার পিছন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে একটি কাগজ দিতে চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাত গুটিয়ে নিলেন (কাগজটি নিলেন না এবং) বললেন, আমি জানি না, এটা কি পুরুষের হাত না নারীর। মহিলা আরজ করলেন, ‘নারীর হাত।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি যদি নারী হতে তাহলে নিশ্চয়ই নখে মেহেদী থাকত।’

-সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পীর-মুর্শিদ ও উস্তাদের সাথেও পর্দা করা অপরিহার্য।

হযরত উমাইমা বিনতে রুকাইকা রা. থেকে বাইয়াত সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে যে, নারীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতি আমাদের নিজেদের চেয়েও মেহেরবান। সুতরাং আপনার হাত মোবারক দিন, আমরা বাইয়াত হই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি নারীদের সাথে হাত মিলাই না। (যা মুখে বলেছি তা মেনে চলাই তোমাদের জন্য অপরিহার্য)।

-মুয়াত্তা মালিক

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর কসম! বাইয়াতের সময় তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মুখে বলতেন, তোমাকে বাইয়াত করলাম।-সহীহ বুখারী ২/১০৭১

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

দুই শ্রেণীর দোযখী এখনও আমি দেখিনি। (কারণ তারা এখন নেই, ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করবে) এক শ্রেণী হচ্ছে ঐ সকল মানুষ, যাদের হাতে ষাঁড়ের লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে) ঐ সকল নারী, যারা হবে পোশাক পরিহিতা, নগ্ন, আকৃষ্ট ও আকৃষ্টকারী; তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে যাবে না এবং জান্নাতের খুশবুও পাবে না অথচ জান্নাতের খুশবু তো এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে।

-মুসলিম ২/২০৫, হাদীস : ২১২৮

এই হাদীসে বেপর্দা নারীদের প্রতি কঠিন হুঁশিয়ারি শোনানো হয়েছে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর আগেই তাওবা করে পর্দার বিধানের দিকে ফিরে আসা কর্তব্য।

উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল যে, কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে। এই বিধান মেনে চলা সকল ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য অপরিহার্য। এবার ঐ সকল নিকটাত্মীয়দের কথা উল্লেখ করছি, যাদের মাঝে পর্দার হুকুম নেই। এরা ছাড়া অন্য সকলের সাথেই পর্দা করতে হবে।

যাদের সাথে পর্দা নেই

মাহরাম পুরুষের সাথে নারীর পর্দা নেই। মাহরাম পুরুষ দ্বারা উদ্দেশ্য হল এমন পুরুষ আত্মীয়, যার সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-পিতা, ভাই ইত্যাদি।

আর যে পুরুষের সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর বোন বা এমন নারীর বিবাহে থাকা, যাদের দু’জনকে বিবাহসূত্রে একত্র করা জায়েয নয়) দূর হওয়ার পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম। তার সাথে পর্দা করা ফরয।

পুরুষের জন্য মাহরাম ও গায়র-মাহরাম নারী

একজন পুরুষের মাহরাম নারী হল এমন নারী, যার সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-মা, মেয়ে ইত্যাদি।

পক্ষান্তরে যে নারীর সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর অন্য পুরুষের বিবাহে থাকা) দূর হওয়ার পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম।

মাহরামের প্রকারভেদ

সাধারণত তিন ধরনের সম্পর্ককে শরীয়ত মাহরাম হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছে।

যথা : ক) বংশীয়/ঔরসজাত সম্পর্ক। খ) দুধ সম্পর্ক ও গ) বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত সম্পর্কের কারণে মাহরাম নারীর বংশ সম্পর্কিত মাহরাম পুরুষগণ হলেন-১. পিতা, দাদা-নানা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ। ২. পুত্র, পৌত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৩. ভাই-সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয়। ৪. ভ্রাতুষ্পুত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৫. ভাগ্নে (সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের ছেলে)। ৬. চাচা।

৭. মামা।

আল্লাহ তাআলার বাণী-

ولا يبدين زينتهن الا لبعولتهن او ابآئهن او ابآء بعولتهن او ابنآئهن او ابنآء بعولتهن او اخوانهن او بنى اخوانهن او بنى اخوتهن او نسائهن او ما ملكت ايمانهن او التبعين غير اولى الاربة من الرجال او الطفط الذين لم يظهروا على عورت النساء

(তরজমা) তারা যেন নিজেদের আভরণ প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। (সূরা নূর (২৪) : ৩১)

পুরুষের বংশ সম্পর্কিত মাহরাম নারীগণ হলেন-

১. মা ২. কন্যা ৩. ভগ্নী ৪. ফুফু, ৫. খালা ৬. ভ্রাতুষ্পুত্রী ৭. ভাগ্নী।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

حرمت عليكم امهتكم وبنتكم واخوتكم وعمتكم وخلتكم وبنت الاخ وبنت الاخت.

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, ভগ্নী, ফুফু, খালা, ভ্রাতুষ্পুত্রী, ভাগ্নী। … (সূরা নিসা (৪) : ২৩)

দুধ সম্পর্কের কারণে মাহরাম দুগ্ধপানের কারণেও মাহরাম সাব্যস্ত হয়ে থাকে। দুধ মা, দুধ কন্যা, দুধ বোন ইত্যাদি নারীগণ পুরুষের মাহরাম পরিগণিত হবেন। অনুরূপভাবে দুধ পিতা, দাদা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ, দুধ পুত্র ও তদস্তন পুরুষ, দুধ ভাই ইত্যাদি পুরুষ নারীর মাহরাম হিসেবে গণ্য হবেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

حرمت عليكم امهتكم … وامهتكم التى ارضعنكم واخوتكم من الرضاعة

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা … দুধ-মা, দুধ বোন। … (সূরা নিসা : (৪) : ২৩)

বিখ্যাত মুফাসসির আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-

একজন নারী যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করায় তাহলে সে দুগ্ধ পানকারীর জন্য হারাম হয়ে যায়। কারণ সে তার মা। তেমনি দুধমার মেয়ে, বোন হওয়ার কারণে; দুধমার বোন, খালা হওয়ার কারণে; দুধমার মা, নানী হওয়ার কারণে; দুধমার স্বামীর অন্য পক্ষের কন্যা, বোন হওয়ার কারণে; স্বামীর বোন, ফুফু হওয়ার কারণে; স্বামীর মা, দাদী হওয়ার কারণে ঐ শিশুর জন্য হারাম হয়ে যায়। তেমনি দুধমার ছেলে-মেয়ের সন্তানাদিও হারাম হয়ে যায়। কারণ তারা তার ভাই-বোনের

সন্তানাদি। (তাফসীরে কুরতুবী ৫/৭২)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আবুল কুয়াইসের ভাই আফলাহ (যিনি আয়েশা রা.-এর দুধ চাচা) একবার আমার নিকট আসার অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসার পর তাঁকে ঘটনাটি জানালাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদানের আদেশ করলেন।

মুসলিমের রেওয়ায়েত অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার সাথে পর্দা করো না। কেননা, বংশীয় সম্পর্কের দ্বারা যা হারাম হয়, দুধ সম্পর্ক দ্বারাও তা হারাম হয়।

-সহীহ বুখারী ৮/৩৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪৪৪; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৪৭; সুনানে নাসায়ী ৬/৯৯

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে মাহরাম

মাহরাম সাব্যস্ত হওয়ার তৃতীয় কারণ হল বিবাহ। বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারাও নারী-পুরুষ একে অপরের মাহরাম সাব্যস্ত হয়। নারীর বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম পুরুষ হল স্বামীর পিতা (শ্বশুর), স্বামীর অন্য পক্ষের পুত্র ইত্যাদি। তেমনিভাবে নিজের শাশুড়ি, স্ত্রীর গর্ভজাত অন্য পক্ষের কন্যা ইত্যাদি নারীও পুরুষের জন্য মাহরাম গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وحرمت عليكم امهتكم … وامهت نسائكم وربآئبكم التى فى حجوركم من نسائكم التى دخلتم بهن …

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, … শাশুড়ি ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সাথে সংগত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসে তার গর্ভজাত কন্যা, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে।… (সূরা নিসা : ২৩)

ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. বলেন-বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম নারী চার প্রকার : ১. স্ত্রীর মা (শাশুড়ি) ২. স্ত্রীর কন্যা ৩. পিতার স্ত্রী (সহোদর মা, সৎ মা) ও ৪. পুত্রবধু। (তাফসীরে কুরতুবী ২/৭৪)

উল্লেখ্য, শাশুড়ি বলতে স্ত্রীর মা, দাদী-নানী এভাবে উপরের দিকের সকলকে বোঝাবে। তবে স্ত্রীর খালা, ফুফু অর্থাৎ খালা শাশুড়ি, ফুফু-শাশুড়ি মাহরাম নয়। এঁদের সাথে পর্দা আছে। একই কথা নারীর ক্ষেত্রে। স্বামীর পিতা, দাদা ও নানার সাথে পর্দা নেই। তবে স্বামীর চাচা, মামা অর্থাৎ চাচা-শ্বশুর, মামা-শ্বশুরের সাথে পর্দা আছে।

উপরের আলোচনা থেকে পর্দার বিধান পালন সম্পর্কে আমরা যা পেয়েছি তা হচ্ছে-

এক. পর্দার বিধান পালন করার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালন করা, যা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-

وما كان لمؤمن ولا مؤمنة اذا قضى الله ورسوله امرا ان يكون لهم الخيرة من امر

(তরজমা) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৬)

দুই. পর্দার বিধান মেনে চলা হচ্ছে ঈমানের দাবি। কেননা আল্লাহ তাআলা পর্দা-বিধানের ক্ষেত্রে শুধু ঈমানদার নারীপুরুষকেই সম্বোধন করেছেন।

তামীম গোত্রের কয়েকজন নারী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আগমন করল, যাদের পরনে ছিল পাতলা কাপড়। উম্মুল মুমিনীন তাদেরকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তোমরা যদি মুমিন নারী হও তাহলে এ তো মুমিন নারীর পোশাক নয়। আর যদি মুমিন না হও তাহলে তা ব্যবহার করতে পার।’ (মাআলিমুস সুনান ৪/৩৭৬)

এক নববধুকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আনা হল, যার পরনে ছিল রঙ্গিন কিবতী চাদর। তখন উম্মুল মুমিনীন রা. বললেন, ‘যে নারী এ রকম পোশাক পরিধান করে তার তো সূরা নূরের প্রতি ঈমান নেই।’ (তাফসীরে কুরতুবী ১৪/২৪৪)

তিন. পর্দাপালন হল সতর।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক লাজুক ও পর্দাশীল। তিনি লজ্জা ও পর্দাকে পছন্দ করেন।

(আবু দাউদ, হাদীস : ৪০১২, ৪০১৩; সুনানে নাসাঈ ১/২০০; মুসনাদে আহমদ ৪/২২৪

আল্লাহ তাআলা পিতা আদম ও হওয়া আ.-এর প্রতি পর্দার নেয়ামতকে বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

ان لك الا تجوع فيها ولاتعرى

(তরজমা) তোমার জন্য এ-ই রইল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না এবং নগ্নও হবে না।-সূরা ত্বহা (২০) : ১১৮)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

يبنى ءادم قد انزلنا عليكم لباسا يورى سوءتكم وريشا ولباس التقوى ذلك خير.

(তরজমা) হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশ-ভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ এটাই সর্বোৎকৃষ্ট।- সূরা আ’রাফ (৭) : ২৬)

চার. পর্দা হল নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতার উপায়। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তা ঘোষণা করেছেন।

পাঁচ. পর্দা হল ইফফাত তথা চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উপায়। এই ইফফত ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুআর অংশ। তিনি দুআ করতেন-

أسألك الهدى والتقى والعفة

অন্য রেওয়ায়েতে

إني أسألك الهدى والتقى والعفاف

অর্থ : (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি হেদায়েত, তাকওয়া ও ইফফত (চারিত্রিক পবিত্রতা)।

-সহীহ মুসলিম (কিতাবুয যিকর; জামে তিরমিযী (দাওয়াত অধ্যায়); ইবনে মাজাহ (দুআ অধ্যায়); মুসনাদে আহমদ ১/৪১১, ৪১৬ ও ৪৩৬

এই পবিত্রতা হচ্ছে জান্নাতী নারীদের একটি গুণ। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা তাদের অসাধারণ রূপের বর্ণনা দেওয়ার সাথে সাথে একথাও বলেছেন যে, তারা নির্ধারিত গৃহে অবস্থান করবে এবং নিজ স্বামী ছাড়া অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। তো তাদের সৌন্দর্যের পাশপাশি তাদের পবিত্রতারও প্রশংসা করেছেন। সুতরাং রূপ-সৌন্দর্যের সাথে যদি ইফফাত ও সতীত্ব থাকে তবে এরচেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?!! আর পর্দাই হল সতীত্ব রক্ষার উপায়।

আল্লাহ আমাদেরকে পর্দার বিধান মেনে চলার তাওফিক দিক।আমিন।

সূত্রঃ সংগৃহিত

সুন্নাতে খাৎনা উপলক্ষে অনুষ্ঠান করা যাবে কি ?? ইসলাম কি বলে ??

সুন্নাতে খাৎনা উপলক্ষে অনুষ্ঠান করার বিধান —
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
আমাদের সমাজে তো আজকাল খাৎনা উপলক্ষে বিশাল বিশাল অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। আত্মীয়-স্বজনসহ সকলকে দাওয়াত দেয়া হয় সাথে সাথে কার্ড ছাপানো হয় আর যারা ধনী আছে তারা তো এই অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে থাকে। এই বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

খাৎনার অনুষ্ঠান করা যাবে না এবং এর দাওয়াতও খাওয়া যাবে না। কারণ এগুলো কুসংস্কার, যা সমাজ থেকে তুলে দেয়া যরূরী। খাৎনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং ইসলামী নিদর্শন সমূহের অন্যতম। যা সন্তানের অভিভাবককে পালন করতে হবে। যেখানে কোন প্রচার থাকবে না বা কোন অনুষ্ঠান থাকবে না। রাসূল ও ছাহাবীগণ এর জন্য কোন অনুষ্ঠান করেননি।

খাৎনা উপলক্ষে লোকদের দাওয়াত করে খাওয়ানো হচ্ছে বিদআত। হযরত উসমানকে (রা) জনৈক ব্যক্তি খাৎনার দাওয়াত দিলে তিনি সেখানে যেতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর যুগে এ ধরণের কোনো অনুষ্ঠানের অস্তিত্ব ছিলো না। [ইমদাদুল মুফতীন ১২১]