কোরআন হাত থেকে পড়ে গেলে কিংবা পুরানো হলে কি করণীয় !! জেনে নিন ইসলাম কি বলে !!

পবিত্র কোরআনে কারিম আল্লাহতায়ালার কালাম। অতএব যে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর ইমান রাখে, তার ওপর কোরআনে কারিমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও অপমান থেকে তা রক্ষা করা অবশ্য কর্তব্য। কোনো কোরআনের কপি যদি, পুরনো হয়, ছিড়ে যায় ও তার পৃষ্ঠাগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়, তাহলে এমন জায়গায় রাখা যাবে না, যেখানে ওইসব পাতার অমর্যাদা হয়, ময়লা-আবর্জনায় পতিত হয়, মানুষ বা জীবজন্তু দ্বারা পিষ্ট হয়।

হাত থেকে পড়ে গেলে যা করবেন: আমাদের সমাজে প্রচলন রয়েছে, কারো হাত থেকে ভুলে বা অন্য কোনোভাবে কোরআনে কারিম পড়ে গেলে, কোরআনের ওজন পরিমাণ চাল দান করে দিতে হয়। আসলে এর কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। কারো হাত থেকে কোরআন পড়ে গেলে এ জন্য সে অনুতপ্ত হবে, ভবিষ্যতে যেন আর কোরআন না পড়ে সে জন্য সতর্ক থাকবে।

এভাবে শুধু পবিত্র কোরআনে কারিম নয়, হাদিস গ্রন্থ থেকে শুরু করে, কায়দা, আমপাড়া এমনকি ইসলামি বইপুস্তক যেখানে কোরআনের আয়াত লিপিবদ্ধ আছে সেসবেরও একই হুকুম। এদিকে লক্ষ্য রেখেই ইসলামি স্কলাররা বলেন, যত্রতত্র বিশেষ করে পোস্টার হ্যান্ডবিলে কোরআনের আয়াত বা হাদিসের উদ্ধৃতি না লেখা। কারণ, এসবের সংরক্ষণ হয় না।

পুরনো কোরআন যদি বাঁধাই করে পাঠ উপযোগী করা সম্ভব হয়, তাহলে পরিত্যক্ত না রেখে ব্যবহার করা শ্রেয়। অনুরূপভাবে প্রকাশক বা কারো অবহেলা ও ভুলের কারণে কোরআনে কারিমে যদি ভুল ছাপা হয়, আর সংশোধন করা সম্ভব হয়, তাহলে সংশোধন করে পাঠ উপযোগী করা জরুরি।

তবে পুরনো বা ভুলছাপার কোরআন যদি একেবারেই পাঠ উপযোগী করা সম্ভব না হয়, তাহলে অসম্মান ও বিকৃতি থেকে সুরক্ষার জন্য কোরআনের ওই কপিগুলো নিরাপদ স্থানে দাফন করা জরুরি। নিরাপদ স্থান বলতে ওই স্থানকে বুঝায়, যেখানে মানুষ চলাচল করে না, ভবিষ্যতে অপমানের সম্মুখিন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

পুরনো ও ব্যবহার অনুপযুক্ত কোরআন সুরক্ষার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে তা পুড়িয়ে দেয়া। হজরত উসমান (রা.) কোরাইশি হরফের কোরআন রেখে অবশিষ্ট কোরআনের কপিগুলো পোড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মর্মে একটি বর্ণনা ইমাম বোখারি (রহ.) উল্লেখ করেছেন।

তবে পুরনো কোরআনের কপি পোড়ানোর ক্ষেত্রে আলেমরা বলেন, এসব ভালো করে পুড়ে ছাই করা জরুরি, কারণ অনেক সময় পোড়ানোর পরও হরফ অবশিষ্ট থাকে। পুরনো কোরআন দাফন করা অপেক্ষা পোড়ানো উত্তম। কারণ, দাফনের পর কখনো ওপর থেকে মাটি সরে গেলে দাফনকৃত কোরআনের অসম্মান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পোড়ানো ও পোড়ানোর পর ছাইগুলো দাফন করা অধিক শ্রেয়।

অনেকে ব্যবহার অনুপযুক্ত কোরআনের কপি পানিতে ফেলে দেন। এটা ঠিক না। কারণ, পানিতে ভাসমান অবস্তায় এসব কোরআনের কপি যে কোনো ময়লা-আবর্জনা কিংবা নাপাক স্থানে গিয়ে ঠেকতে পারে। তাই এ পদ্ধতি সঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, একান্তই যদি পানিতে ভাসিয়ে দিতে হয়, তাহলে প্রবহমান নদীতে ভারী কোনো কিছু বেঁধে তারপর ফেলতে হবে।

নামাজে ভুল হলে পড়ে নিন সাহু সিজদা, নতুবা হবে না নামাজ….!!

নামাজে যদি কোনও ওয়াজিব তরক হয়ে যায় তাহলে আপনাকে অবশ্যই সাহু সিজদা দিতে হবে। তা না হলে আপনার নামাজ হবে না। সাহু সিজদার এ মাসালাগুলো ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়ম হচ্ছে – “সালাতে কম বেশি যাই হোক, আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ, দুয়া মাসুরা পড়ে তাকবীর দিয়ে পর পর দুটি সিজদাহ দিয়ে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করতে হবে।”
বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত সালাত অধ্যায় সাহো অনুচ্ছেদ, ১১৮ নাম্বার হাদিস।
অথবা, “সালাতে কম বেশি যাই হোক, সালামের ফেরানোর আগে বা পরে দুইটি (অতিরিক্ত) সাহু সিজদা দিতে হবে।”
সহীহ মুসলিম, নাওয়াতুল আওতার ৩/৪১১।

অর্থাৎ দুইটাই জায়েজ, সালামের আগে বা পরে দুইটা অতিরিক্ত সিজদা দেওয়া।
সালাম ফেরানোর আগে সিজদা সাহু যেভাবে করবেন: সিজদা সাহু দেওয়া ওয়াজিব হয় এমন কোন ভুল করলে, শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ, দুয়া মাসুরা পরে ডানে ও বামে দুইদিকে সালাম ফেরাবেন। এরপরে আল্লাহু আকবার বলে দুইটি সিজদা সাহু দেবেন। দুই সিজদার মাঝখানে বা সিজদাতে তাসবিহর পরে দুয়া করতে পারবেন। ২টা অতিরিক্ত সিজদা দিয়ে আর কিছু পড়তে হবেনা, আবার ডানে ও বামে দুইদিকেই সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।

তবে নামাজে যদি কোনো ফরজ তরক হয়ে যায় তাইলে আবার নতুন করে নামাজ পড়তে হবে। তিনটি কারণে নামাযে সাহু সিজদা দিতে হয়
১) নামায বৃদ্ধি হওয়া। যেমন, কোন রুকু, সিজদা বা বসা ইত্যাদি বৃদ্ধি হওয়া।
২) কোন রুকন বা ওয়াজিব কম হওয়া।
৩) সন্দেহ হওয়া।

নামায বৃদ্ধি হওয়া:
যদি নামাযের অন্তর্ভুক্ত এমন কিছু কাজ ভুলবশত বৃদ্ধি করে যেমন: দাঁড়ানো, বসা, রুকু, সিজদা ইত্যাদি- যেমন দু‘বার করে রুকু করা, তিন বার সিজদা করা, অথবা যোহর পাঁচ রাকাত আদায় করা। তবে সাহু সিজদা করবে। নামাজরত অবস্থায় যদি উক্ত বৃদ্ধি স্মরণ হয়- যেমন চার রাকাত শেষ করে পাঁচ রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে- তবে সে ফিরে আসবে এবং শেষে সিজদায়ে সাহু করবে।

সালাত পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো:
নামায পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো নামায বৃদ্ধি করার অন্তর্গত। যদি অনেক পরে এ ভুলের কথা মনে পড়ে তবে নামায পুনরায় ফিরিয়ে পড়বে। আর যদি একটু পরেই (যেমন দু/এক মিনিট) মনে পড়ে, তবে সে অবশিষ্ট নামায পূর্ণ করবে এবং সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।

নামাযে রুকন বা ওয়াজিব কম হওয়া।:
ক) যদি ভুলক্রমে ওয়াজিব পরিত্যাগ হয় আর উক্ত স্থান ছেড়ে যাওয়ার আগেই যদি স্মরণ হয়ে যায় তবে তা আদায় করবে এতে কোন দোষ নেই- সাহু সিজদা দিতে হবে না। কিন্তু যদি উক্ত ওয়াজিব ছেড়ে পরবর্তী রুকন শুরু করার আগেই স্মরণ হয়ে যায় তবে ফিরে গিয়ে সেই ওয়াজিব আদায় করবে এবং শেষে সাহু সিজদা করবে। কিন্তু পরবর্তী রুকন শুরু করার পর যদি স্মরণ হয় তবে উক্ত ছুটে যাওয়া ওয়াজিব রহিত হয়ে যাবে। অবশিষ্ট নামায আদায় করে সালামের পূর্বে সাহু সিজদা করলেই নামায পূর্ণ হয়ে যাবে।

যেমন কেউ দ্বিতীয় রাকাতের দ্বিতীয় সিজদা থেকে উঠে না বসে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে যাচ্ছে। এমন সময় স্মরণ হল নিজ ভুলের কথা। তখন সে বসে পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাত পূর্ণ করবে। কোন সাহু সিজদা লাগবে না।
আর যদি কিছুটা দাঁড়ায় কিন্তু পরিপূর্ণরূপে দাঁড়ায়নি তবে সে বসে যাবে এবং তাশাহুদ পড়বে ও সালাত শেষে সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে। কিন্তু যদি পূর্ণরূপে দাঁড়িয়ে পড়ে তবে আর বসবে না। তাশাহুদ রহিত হয়ে যাবে। ঐভাবেই নামায পূর্ণ করবে এবং সালাম ফিরানোর পূর্বে সাহু সিজদা করবে।

খ) ফরজ নামাজের প্রথম ২ রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য একটি সুরা মিলানো ওয়াজিব। যদি আপনি ভুল করে ফরজ নামাজের প্রথম ২ রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়ার পর অন্য কোনো সুরা না পড়েন, তাহলে আপনাকে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে। আপনি যদি যে কোনো সুন্নাত/নফল নামাজের যে কোনো রাকাতে সুরা ফাতেহা বা সুরা ফাতেহার পর অন্য একটি সুরা না পড়েন তাহলে আপনাকে সিজদায়ে সাহু দিতে হবে।

সন্দেহ হওয়া:
নামাযের মধ্যে সন্দেহের দু‘টি অবস্থা: প্রথম অবস্থা: সন্দেহযুক্ত দু‘টি বিষয়ের মধ্যে যেটির প্রাধান্য পাবে সে অনুযায়ী কাজ করবে এবং নামায পূর্ণ করে সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।
উদাহরণ: একজন লোক যোহরের নামায আদায় করছে। কিন্তু সন্দেহ হল এখন সে কি দ্বিতীয় রাকাতে না তৃতীয় রাকাতে? এ সময় সে অনুমান করে স্থির করবে কোনটা ঠিক। যদি অনুমান প্রাধান্য পায় যে এটা তৃতীয় রাকাত, তবে তা তৃতীয় রাকাত গণ্য করে নামায পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরানোর পর সাহু সিজদা করবে।

দ্বিতীয় অবস্থা: সন্দেহযুক্ত দু‘টি দিকের কোনটাই প্রাধান্য পায় না। এ অবস্থায় নিশ্চিত দিকটির উপর ভিত্তি করবে। অর্থাৎ কম সংখ্যাটি নির্ধারণ করে বাকী নামায পূর্ণ করবে। তারপর সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।
একই নামাজে সিজদায়ে সাহু করার একাধিক কারণ পাওয়া গেলেও একটি সিজদায়ে সাহু করলেই হবে।