ইসলাম কি বলে…’মৃত্য ব্যক্তির নামে কোরআন খতম-চল্লিশা’- কি ঠিক…?? জেনে নিন বিস্তারিত

আমাদের সমাজে একটা রীতি প্রচলিত রয়েছে সেটা হলো- কোন ব্যক্তি যদি মারা যায়, তাহরের মারা যাওয়ার সাত দিনের পর অথবা মারা যাওয়ার পর প্রথম শুক্রবার আল কোরআনের হাফেজদের ডেকে কোরআন খতম করানো। এছাড়া মৃত্যুর চল্লিশ দিনের মাথায় বিশাল মজলিশের মাধ্যমে মেজবানের আয়োজন করা হয়। ইসলামে মূলত এগুলো জায়েজ আছে কিনা জানতে হলে নিচের বর্ণনাটি পড়ুন।

মেজবান বলতে বোঝায় মানুষকে খাওয়ানো। লোকদের খাওয়ানো একটি ভালো কাজ। বুখারি শরিফের মধ্যে রাসুল (সা.) বলেছেন, এটি একটি আফতারুল ইসলাম, ইসলামের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কাজ। সুতরাং আপনি লোকদের খাওয়াইতে পারেন; কিন্তু সেখানে আনুষ্ঠানিকতা চার দিনে, ১০ দিনে, চল্লিশা ইত্যাদি করেন তাহলে আপনি সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ করলেন।
সে ক্ষেত্রে সওয়াব তো দূরের কথা, বেদাত হওয়ার কারণে আপনি বড় ধরনের কবিরা গুনাহর মধ্যে লিপ্ত হয়ে গেলেন। সুতরাং এ ধরনের কাজ করবেন না, তাহলে আমলও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক হাদিস দ্বারা এই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই মেজবান বা চল্লিশা এ জাতীয় নাম না দিয়ে আপনি যেকোনো দিন আপনার সুবিধামতো আত্মীয়স্বজন বা গরিবদের খাওয়াতে পারেন, মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করতে পারেন।
এরপর কোরআন খতম আপনি নিজে করবেন। কোরআন খতম করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন। মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন খতম করার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.) অথবা সাহাবিদের আমল দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি। এটাও আমরা নিজেরাই আবিষ্কার করে নিয়েছি।
মৃত ব্যক্তির জন্য কোরআন খতম না করে কোরআন খতম আমরা নিজেরাই করব, তারপর আমরা লোকদের মেজবান খাওয়াব। আমরা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-খয়রাত করব, ছদকায়ে জারিয়া করব। আর বেশি বেশি করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করব। এটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

গান-বাজনা কি আসলেই হারাম ….?? জেনে নিন কি বলছে ইসলাম…!!

অনেকেই মুখে মুখে বলে থাকেন গান বাজনা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। কিন্তু আপনি এই কথাটি জেনে বলছেন কি? এ বিষয়ে যারা জানেন না তার অবশ্যই কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ি বর্ণিত নিচের লেখাটি পড়ুন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআন মাজিদে বলেন,“এক শ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে পথভ্রষ্ট করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে অন্ধভাবে এবং উহাকে(আল্লাহর পথ) নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে। এদের জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি”। [৩১-৬]

আল-ওয়াহিদি (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা), অন্যান্য তাফসীরকারগণের সাথে ব্যাখ্যা করেন যে, এই আয়াতে “অবান্তর কথাবার্তা” বলতে গান সঙ্গীতকে বুঝানো হয়েছে। যেসকল সাহাবাগণ এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন তারা হলেন ইবন আব্বাস, ইবন মাসউদ, মুজাহিদ, ইকরিমা(রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। ইবন মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, ‘অবান্তর কথাবার্তা’ হল গান”।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,“আমার উম্মতের মধ্য হতে একদল লোক এমন হবে যারা ব্যভিচার, রেশমি বস্ত্র পরিধান, মদ পান এবং বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার ইত্যাদি হালাল মনে করবে। এবং কিছু লোক এমন হবে যারা একটি পর্বতের নিকটে অবস্থান করবে এবং সন্ধ্যাবেলায় তাদের মেষপালক তাদের নিকট মেষগুলো নিয়ে আসবে এবং তাদের নিকট কিছু চাইবে, কিন্তু তারা বলবে, ‘আগামীকাল ফেরত এসো’। রাতের বেলায় আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ধ্বংস করে দিবেন এবং তাদের উপর পর্বত ধ্বসিয়ে দিবেন, বাকি লোকদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করে দিবেন এবং শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত তারা এই অবস্থায় থাকবে”। [বুখারী, ভলিউম ৭, বুক ৬৯,সংখ্যা৪৯৪]

এই হাদীসে উল্লেখ হচ্ছে বাদ্যযন্ত্র হারাম, এবং উলামাগণের মধ্যে এই ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। ইবন আল-কাইয়্যিম (রাহিমুল্লাহ) তাঁর বই ইগাছাতুল লাহফান এ বলেন, “যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘বৈধ মনে করবে’, তার মানে তিনি বুঝিয়েছেন এটা অবৈধ, এরপর লোকেরা একে বৈধ বানিয়েছে ”।
• আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,‘একদল লোকদেরকে তিনি বানর ও শূকরে পরিণত করে দিবেন’ সাহাবাগণ আরজ করলেন, “তারা কি ‘লা~ ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এই সাক্ষ্য প্রদান করে?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হ্যাঁ, এবং তারা সিয়াম ও হজ্জও পালন করে”। সাহাবাগণ আরজ করলেন, “তাহলে, তাদের সমস্যা কি ছিল?” তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তারা বাদ্যযন্ত্র, ঢোল ও নারী সঙ্গীতশিল্পী ব্যবহার করবে। (একদিন) তারা রাতভর মদপান, হাসি তামাশা করে নিদ্রা যাবে, সকালে(আল্লাহর ইচ্ছায়) তারা বানর ও শূকরে পরিণত হবে”। [ইগাছাতুল লাহফান]

• আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের কাবাঘরের চারপাশের ইবাদতের কথা সমালোচনা করে বলেন,“(এ ঘরের পাশে) তাদের (জাহেলী যুগের)নামায তো কিছু শিষ দেয়া ও তালি বাজানো ছাড়া কিছুই ছিল না”[সূরা আল আনফাল ৮-৩৫] ।ইবন আব্বাস, ইবন উমর, আতিয়্যাহ, মুজাহিদ, আদ-দাহাক, আল হাসান এবং ক্বাতাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মু’কান’ অর্থ শিষ বাজানো, ‘তাসদিয়াহ’ অর্থ তালি বাজানো।

কুরআন মজীদের অন্য আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজী পেশ করলে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বললেন,“তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর”।-সূরা ইসরা : ৬৪এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহ. বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯
বস্তুত গান বাজনার ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, তা নাজায়েয হওয়ার জন্য আলাদা কোনো দলীল খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বহু হাদীসের মাধ্যমে তা প্রমাণিত।

• গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১২৮২; ইবনে মাজাহ হাদীস : ২১৬৮বর্তমানে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম।

• রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন,আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন।-সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ৪০২০; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৬৭৫৮

• হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।-ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২উপরোক্ত বাণীর সত্যতা এখন দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার। গান-বাজনার ব্যাপক বিস্তারের ফলে মানুষের অন্তরে এই পরিমাণ নিফাক সৃষ্টি হয়েছে যে, সাহাবীদের ইসলামকে এ যুগে অচল মনে করা হচ্ছে এবং গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা ইত্যাদিকে হালাল মনে করা হচ্ছে।

• বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত নাফে’ রাহ. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার চলার পথে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বাঁশির আওয়াজ শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে আঙ্গুল দিলেন। কিছু দূর গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হে নাফে’! এখনো কি আওয়াজ শুনছ? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না

ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলা দেখার হুকুম কি, জেনে নিন এই বিষয় ইসলাম কি বলছে !!

এ খেলা যিনি দেখবেন, তিনি গুনাহগার হবেন তিন দিক থেকে : প্রথমত. মূল্যবান সময় নষ্ট করার কারণে, যা একজন মানুষের আওতাধীন সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। আর মানুষ তার জীবনকাল সম্পর্কে সাধারণভাবে এবং যৌবনকাল সম্পর্কে বিশেষভাবে জিজ্ঞাসিত হবে। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিতম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لاَ تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلاَهُ ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ.

‘কিয়ামতের দিন যতক্ষণ পর্যন্ত কোন বান্দাকে পাঁচটি প্রশ্ন না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সামনে থেকে তার দুটি পা এক কদম অগ্রসর হবে না; তাকে তার বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে; সে কিসে তা ক্ষয় করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে; সে তার যৌবনকালকে কিসের মধ্যে নষ্ট করেছে? তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে; সে তা কিভাবে উপার্জন করেছে? এবং কোন্ পথে তা ব্যয় করেছে? তার ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে; সে যে ইলম অর্জন করেছিল সে মোতাবেক সে আমল করেছিল কি না? [তিরমিযী : ২৪১৬]

দ্বিতীয়ত. সতর তথা শরীরের আবরণীয় অংশ প্রকাশের কারণে। আর এটা তো চাক্ষুস সত্য যে ফুটবল খেলায় সতর খোলা থাকে। এদিকে আমরা জানি যে কোনো প্রয়োজন ছাড়া সতর খোলা কিংবা দেখা জায়েয নেই।
তৃতীয়ত. এতে করে সালাতে বিলম্ব কিংবা সালাত সম্পূর্ণ তরকই হয়ে যায়। এটাও চাক্ষুস ব্যাপার যা অস্বীকারের উপায় নেই। বরং বড় বড় টুর্নামেন্টগুলোয় সবাই জোহরের পর স্টেডিয়ামে আসতে শুরু করে আর মাগরিব পর্যন্ত খেলা দেখে। ফলে আছর নামাজটি অবলীলায় ছুটে যায়। অথচ আছরই সেই সালাত আল্লাহ তা‘আলা যার প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে আদেশ দিয়েছেন।

যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘লা ইরশাদ করেছেন,

﴿حَٰفِظُواْ عَلَى ٱلصَّلَوَٰتِ وٱلصَّلَوٰةِٱلۡوُسۡطَىٰ وَقُومُواْلِلَّهِ قَٰنِتِينَ٢٣٨﴾ [البقرة: ٢٣٨]‘

তোমরা সালাতসমূহ ও মধ্যবর্তী সালাতের হিফাযত কর এবং আল্লাহর জন্য দাঁড়াও বিনীত হয়ে।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৩৮}

তেমনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতেও নানাভাবে এ সালাত বিনষ্ট করার ব্যাপারে কঠোরহুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে।

যেমন : ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« الَّذِى تَفُوتُهُ صَلاَةُ الْعَصْرِ كَأَنَّمَا وُتِرَ أَهْلَهُ وَمَالَهُ » .

‘যার আসর সালাত ছুটে যায়, সে এমন যেন তার (তাবৎ) পরিবার ও সম্পদ হারিয়ে ফেলেছে।’ [বুখারী : ৫৫২; মুসলিম : ৯৯১]

আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« مَنْ تَرَكَ صَلاَةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ » .

যে ব্যক্তি আসরের সালাত তরক করলো সে তার (সব) আমলই হারিয়ে ফেলল।’ [বুখারী : ৫৫৩]

ফুটবল খেলার জন্য সালাত বিলম্ব করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শায়খ উছাইমীন রহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘‌টুর্নামেন্ট দেখার জন্য আপনাদের সালাতে দেরি প্রসঙ্গে বলব, দেখুন আমি আপনাদের পরমপ্রিয় ভাই হিসেবে উপদেশ দিচ্ছি, আপনারা টুর্নামেন্ট দেখে নিজেদের মহামূল্য সময় নষ্ট করবেন না।

কারণ, এতে আমি আপনাদের দুনিয়া বা আখিরাতের কোনো কল্যাণের দিক দেখি না। সন্দেহ নেই এ কেবল সময়ের অপচয়। তাছাড়া আমার জানা মতে অনেক খেলায়ই সতর খোলা থাকে। ট্রাইজারগুলো থাকে উরুর অর্ধেক পর্যন্ত বা এর কাছাকাছি। খেলোয়াড়রা সবাই থাকে তরুণ-যুবা। আর সন্দেহ নেই যুবকদের উরু উন্মুক্ত থাকলে তা ফিতনার কারণ হতে পারে। তেমনি এসব খেলোয়াড়কে দর্শকরা এমন ভক্তি-সম্মান করেন, খেলার বাইরের দিকগুলো বিবেচনা করলে তারা এর উপযুক্ত হতে পারেন না।

ইসলামে দাবা খেলা কেন হারাম..?? জেনে নিন..

বর্তমান সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট, কিংবা টেনিসের সাথে অনেকটাই জনপ্রিয় খেলা দাবা। তবে এই খেলাটিকে নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন, ইসলামে দাবা খেলা কেন হারাম? যদিও অন্যান্য খেলার মতই এটি একটি বুদ্ধির খেলা। এই খেলা খেললে বুদ্ধির চর্চা করা হয়। তারপরও এই খেলাটি কেন ইসলামে নিষিদ্ধ।

যেকোনো কাজ যা মানুষকে আল্লাহ স্মরণ করা থেকে বিরত রাখে তাই হারাম। আবু হানিফা (র) , ইমাম মালিক (র) সহ আরও অনেক ইমাম এক্ষেত্রে একটা কুরআনের আয়াত প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, “হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ,জুয়া,মূর্তি ইত্যাদি এবং লটারির তীর এসব গর্হিত বিষয় শয়তানি কাজ ছাড়া এর কিছুই নয় কাজেই এইসব বিষয় থেকে দূরে থাক,যাতে তোমাদের কল্যাণ হয়।শয়তান তো এটাই চায় যে মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা এবং আল্লাহর স্মরণ এবং সালাত হতে তোমাদেরকে বিরত রাখে,সুতরাং এখনও কি তোমরা ফিরে আসবে?”(মায়েদাহ ৫:৯০-৯১)

আমরা সবাই হয়ত জানি যে ইসলাম সকল প্রকার মূর্তি হারাম করেছে। দাবার প্রায় সব গুটিই কোনো না কোনো মূর্তির আদলে তৈরি। আর এজন্য উপরের হাদিসটি এটাই প্রমান করে যে দাবা খেলা হারাম।

আল কুরতুবী (র) বলেছেন যে, এই আয়াত এটাই নির্দেশ করে যে পাশা বা দাবা খেলা হারাম সেখানে জুয়ার কোন অস্তিত্ব থাকুক আর নাই বা থাকুক কারণ আল্লাহ্ সুবহানাত’লা মদকে হারাম করেছেন এবং এর পেছনে কারণ ও বলে দিয়েছেন, আর কারণটা হচ্ছে শয়তান মানুষের মাঝে নেশা ও বাজির মাধ্যমে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি এবং মানুষকে আল্লাহকে স্মরণ এবং নামাজ থেকে বিরত রাখে । তাই এমন কোন খেলা যা তুচ্ছ জিনিসকে বড় করে তুলে এবং যারা ইহা খেলে তাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরিত করে সাথে সাথে আল্লাহ্র স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখে তাও মদ খাওয়ার মতই হারাম ।

সুলাইমান ইবনে বুরাইদাহ তার পিতা বুরাইদাহ (রাঃ) হইতে বর্ণনা করেছেন।রাসুল (সাঃ) বলেছেন,“যে ব্যাক্তি পাশা খেলল সে যেন শূয়রের গোশত ও রক্তে হাত রাঙাল”।(মুসলিমঃ২২৬০)

আবু মুসা আল আশারি (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেন,“যে পাশা খেলল সে যেন আল্লাহ্ এবং আমাকে অমান্য করল”।(আবু-দাউদঃ৪১২৯,নাসিরুদ্দিন আলবানীর মতে সহীহ)
একদিন দু’জন আনছার ছাহাবী তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা করছিলেন। হঠাৎ একজন বসে পড়লেন। তখন অপরজন বিস্মিত হয়ে বললেন, কি ব্যাপার। কষ্ট হয়ে গেল নাকি? জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, প্রত্যেক বস্তু যা আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে দেয়, সেটাই অনর্থক (لَهْو) … (নাসাঈ, ছহীহাহ হা/৩১৫)। এতে বুঝা যায় যে, বৈধ খেলাও যদি আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে দেয়, তবে সেটাও জায়েয হবে না। ইমাম বুখারী (রহঃ) অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন, ‘প্রত্যেক খেলা-ধুলা (لَهْو) বাতিল, যদি তা আল্লাহর আনুগত্য থেকে উদাসীন করে দেয়’ (ফাৎহুলবারী ‘অনুমতি গ্রহণ’ অধ্যায় ৭৯, অনুচ্ছেদ ৫২; ১১/৯৪ পৃঃ)।

ইসলাম কী বলছে ?? জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস পালন করা কী জায়েজ ?? জেনে নিন বিস্তারিত !!

জন্ম বার্ষিকী পালন ও মৃত্যু বার্ষিকী পালন এমন এক সামাজিক প্রথা হিসাবে চালু হয়ে গেছে যে, কেউ যদি এটা পালন না করে তাহলে তাকে অপরাধী মনে করা হয়। এটা শরীআত পরিপন্থি। আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস ইত্যাদি দিবস পালন করে থাকে।
অনুরূপভাবে শহীদ দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়ে থাকে।

শরীআতের দৃষ্টিতে এই কর্মকান্ড বৈধ্য আছে কি?

বর্তমানে আমাদের দেশে জন্ম বার্ষিকী, মৃত্যু বার্ষিকী পালন করার যে রেওয়াজ প্রচলিত আছে তা বিদআত ও না জায়েয। কারণ এই সকল কাজের জন্য আগে থেকেই দিন তারিখ নির্ধারণ করে রাখা হয় এবং সেদিন খুব ধুমধাম সহকারে দিনটি পালন করা হয়।

জন্ম বার্ষিকী পালন ও মৃত্যু বার্ষিকী পালন এমন এক সামাজিক প্রথা হিসাবে চালু হয়ে গেছে যে, কেউ যদি এটা পালন না করে তাহলে তাকে অপরাধী মনে করা হয়। এটা শরীআত পরিপন্থি।

অনুরূপভাবে শহীদ দিবস পালন করাও না জায়েয। শহীদ দিবস পালন করা যদি পুণ্যের কাজ হতো তাহলে সাহাবায়ে কেরাম উহুদের দিনকে শহীদ দিবস হিসাবে পালন করতেন।

কি নিয়মে পর্দা করবেন ?? জেনে নিন ইসলাম কি বলে ।

অনেকে মনে করেন, পর্দা-বিধান শুধু নারীর জন্য। এ ধারণা ঠিক নয়। পুরুষের জন্যও পর্দা অপরিহার্য। তবে উভয়ের পর্দার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। যে শ্রেণীর জন্য যে পর্দা উপযোগী তাকে সেভাবে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যে কোনো ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিই কুরআন-সুন্নাহর পর্দা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে এই বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, ইসলামে পর্দার বিধানটি অন্যান্য হিকমতের পাশাপাশি নারীর সম্মান ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষার জন্যই দেওয়া হয়েছে। এজন্য এই বিধানের কারণে প্রত্যেককে ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কৃতঘ্ন হয়ে এ বিধান সম্পর্কে অযথা আপত্তি করা উচিত নয়।

আকবর এলাহাবাদী বলেন-

প্রাশ্চাত্যের ও প্রাশ্চাত্য প্রভাবিত পুরুষদের অন্তরে পর্দা পড়ে যাওয়ার কারণে তারা এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে না পারলেও আজকের পশ্চিমা নারীরা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। আর এই বিধানটিই তাদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মাধ্যম হয়েছে।’

আমি পূর্বেই বলেছি, নারী-পুরুষ উভয়ের পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায় হল ইসলামের পর্দা বা হিজাব বিধান। এই বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই হৃদয়-মনের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব। পর্দার এই সুফল স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন।

ইরশাদ হয়েছে-

ذلكم اطهر لقلوبكم وقلوبهن

এই বিধান তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)

সুতরাং মানবসমাজকে পবিত্র ও পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে পর্দা-বিধানের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে বর্তমান সমাজের যুবক ও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা ও নারীজাতির নিরাপত্তার জন্য পর্দা-বিধানের পূর্ণ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি।

পর্দা-বিধান কুরআন মজীদে

পর্দার বিধানটি ইসলামের একটি অকাট্য বিধান। কুরআন মজীদের অনেকগুলো আয়াতে এই বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং কোনো ঈমানদারের পক্ষে এই বিধানকে হালকা মনে করার সুযোগ নেই। এখানে কয়েকটি আয়াত সংক্ষিপ্ত আলোচনাসহ তুলে ধরা হল।

এক.

يا ايها النبى قل لازواجك وبناتك ونساء المؤمنين …

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আহযাব : ৫৯)

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরকে আদেশ করেছেন যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তখন যেন মাথার উপর থেকে ওড়না/চাদর টেনে স্বীয় মুখমন্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে।-ফাতহুল বারী ৮/৫৪, ৭৬, ১১৪

ইবনে সীরিন বলেন, আমি (বিখ্যাত তাবেয়ী) আবীদা (সালমানী রাহ.)কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, কাপড় দ্বারা মাথা ও চেহারা আবৃত করবে এবং এক চোখ খোলা রাখবে।

দুই.

واذا سألتموهن فسئلوهن من وراء حجاب …

তোমরা তাঁদের (নবী পত্নীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। তোমাদের কারো জন্য আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া সংগত নয় এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পত্নীদেরকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য কখনো বৈধ নয়। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা ঘোরতর অপরাধ। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩)

এই আয়াত থেকেও বোঝা যায়, নারীর দেহের কোনো অংশই পর্দা-বিধানের বাইরে নয়। উম্মুল মুমিনীনগণের আমলও তা প্রমাণ করে।

এই আয়াতে যখন পর্দার বিধানকে সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মুল মুমিনীনদের জন্যও অধিকতর পবিত্রতার উপায় বলা হয়েছে তখন উম্মতের আর কে আছে যে এই বিধানের বাইরে থাকতে পারে?

তিন.

قل للمؤمنت يغضنن من ابصارهن ويحفظن فروجهن ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها

তরজমা : (হে নবী!) মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ থাকে তা ছাড়া নিজেদের আবরণ প্রদর্শন না করে। (সূরা নূর : ৩১)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, ‘সাধারণত যা প্রকাশিত’ অর্থ হচ্ছে কাপড়।-তাফসীরে তাবারী ১৮/১১৯

এই ব্যাখ্যা অনুসারে প্রতীয়মান হয় যে, গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর মুখমন্ডলসহ পূর্ণ দেহ আবৃত রাখা অপরিহার্য।

চার.

وليضربن بخمرهن على جيوبهن

তরজমা : তারা যেন গ্রীবা ও বক্ষদেশ মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। … (সূরা নূর : ৩১)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন,

يرحم الله نساء المهاجرات الأول، لما أنزل الله : وليضربن بخمرهن على جيوبهن شققن مورطهن فاختمرن بها.

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রথম শ্রেণীর মুহাজির নারীদের প্রতি দয়া করুন।

আল্লাহ তাআলা যখন

وليضربن بخمرهن على جيوبهن

আয়াত নাযিল করলেন তখন তারা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করেছিলেন।-সহীহ বুখারী ২/৭০০

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-‘ফাখতামারনা’ অর্থ তারা মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।-ফাতহুল বারী ৮/৩৪৭

আল্লামা আইনী রাহ. বলেন-‘ফাখতামারনা বিহা’ অর্থাৎ যে চাদর তারা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন তা দিয়ে নিজেদের মুখমন্ডল আবৃত করলেন। (উমদাতুল কারী ১৯/৯২)

আল্লামা শানকীতী রাহ. বলেন, এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, উপরোক্ত মহিলা সাহাবীগণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মুখমন্ডল আবৃত করারও আদেশ করেছেন। তাই তারা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনার্থে নিজেদের চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমন্ডল আবৃত করেছেন।

পাঁচ.

ولا يضربن بارجلهن ليعلم ما يخفين من زينتهن وتوبوا الى الله جميعا ايه المؤمنون لعلهم تفلحون

(তরজমা) তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা নূর : ৩১)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকা ঈমানদার নারীর কর্তব্য। কারণ পরপুরুষকে নুপুরের আওয়াজ শোনানোর উদ্দেশ্যে সজোরে পদবিক্ষেপ যখন নিষেধ করা হয়েছে তখন যে সকল কাজ, ভঙ্গি ও আচরণ এর চেয়েও বেশি আকৃষ্ট করে তা নিষিদ্ধ হওয়া তো সহজেই বোঝা যায়। মুসলিম নারীদের জন্য এটি আল্লাহ রাববুল আলামীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

পর্দার বিধান হাদীস শরীফে

১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

নারী হল সতর তথা আবৃত থাকার বস্ত্ত। নিশ্চয়ই সে যখন ঘর থেকে বের হয় তখন শয়তান তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। আর সে যখন গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করে তখন সে আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বেশি নিকটে থাকে।-আলমুজামুল আওসাত, তবারানী

এই হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।

২. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নেকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।

(সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮)

কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী বলেন, নারীর জন্য বোরকা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরয। তবে হজ্বের সময়টুকু এর ব্যতিক্রম। কেননা, এই সময় তারা ওড়নাটা চেহারার উপর ঝুলিয়ে দিবে, চেহারার সাথে মিলিয়ে রাখবে না। পরপুরুষ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখবে এবং পুরুষরাও তাদের থেকে দূরে থাকবে। (আরিযাতুল আহওয়াযী ৪/৫৬)

৩. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত কাপড় ঝুলিয়ে রাখে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না। তখন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে মহিলারা তাদের কাপড়ের ঝুল কীভাবে রাখবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এক বিঘত ঝুলিয়ে রাখবে। উম্মে সালামা বললেন, এতে তো তাদের পা অনাবৃত থাকবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে এক হাত ঝুলিয়ে রাখবে, এর বেশি নয়।

-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪১১৭; জামে তিরমিযী ৪/২২৩; সুনানে নাসাঈ ৮/২০৯; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ১১/৮২

ইমাম তিরমিযী বলেন, এই হাদীসে নারীর জন্য কাপড় ঝুলিয়ে রাখার অবকাশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এটিই তাদের জন্য অধিক আবৃতকারী।

৪. ওকবা ইবনে আমের জুহানী রা.-এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-তোমরা নারীদের নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাক। এক আনসারী সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্বামী পক্ষীয় আত্মীয় সম্পর্কে আপনি কী বলেন? তিনি বললে, সে তো মৃত্যু।

-সহীহ বুখারী ৯/২৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১৭২; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৯, ১৫৩

এই হাদীসে বেগানা নারী-পুরুষের একান্ত অবস্থানকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ প্রসঙ্গে স্বামী পক্ষীয় আত্মীয়-স্বজন যেমন দেবর-ভাসুর ইত্যাদির সাথে অধিক সাবধানতা অবলম্বনকে অপরিহার্য করা হয়েছে।

৫. হযরত আয়েশা রা. ইফ্কের দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন-আমি আমার স্থানে বসে ছিলাম একসময় আমার চোখ দুটি নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আসসুলামী ছিল বাহিনীর পিছনে আগমনকারী। সে যখন আমার অবস্থানস্থলের নিকট পৌছল তখন একজন ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি দেখতে পেল। এরপর সে আমার নিকট এলে আমাকে চিনে ফেলল। কারণ পর্দা বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। সে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলে ওঠে, যার দরুণ আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং ওড়না দিয়ে নিজেকে আবৃত করে ফেলি।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে, আমি ওড়না দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেলি।

-সহীহ বুখারী ৫/৩২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৭৭০; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩১৭৯

৬. উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা রা.ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখছেন না?! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না?

-সুনানে আবু দাউদ ৪/৩৬১, হাদীস : ৪১১২; জামে তিরমিযী ৫/১০২, হাদীস : ২৭৭৯; মুসনাদে আহমাদ ৬/২৯৬; শরহুল মুসলিম, নববী ১০/৯৭; ফাতহুল বারী ৯/২৪৮

৭. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সামনাসামনি চলে আসত তখন আমাদের সকলেই চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার তা সরিয়ে নিতাম।

-মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২৯৩৫

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পরপুরুষের সামনে চেহারা ঢেকে রাখা আবশ্যক।

৮. আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত করে রাখতাম। …

-মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সাহাবা-যুগের সাধারণ মহিলারাও গায়র মাহরাম পুরুষ থেকে নিজেদের চেহারা আবৃত করতেন। কারণ আসমা বিনতে আবি বকর রা. এখানে বহুবচন ব্যবহার করেছেন। যা প্রমাণ করে উম্মুল মুমিনগণ ছাড়া অন্য নারীরাও তাদের মুখমন্ডল আবৃত রাখতেন।

৯. ফাতিমা বিনতে মুনযির রাহ. বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম।-মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪

হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যখনই কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাত করে তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।-জামে তিরমিযী

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, একজন মহিলা পর্দার পিছন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে একটি কাগজ দিতে চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাত গুটিয়ে নিলেন (কাগজটি নিলেন না এবং) বললেন, আমি জানি না, এটা কি পুরুষের হাত না নারীর। মহিলা আরজ করলেন, ‘নারীর হাত।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি যদি নারী হতে তাহলে নিশ্চয়ই নখে মেহেদী থাকত।’

-সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ী

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, পীর-মুর্শিদ ও উস্তাদের সাথেও পর্দা করা অপরিহার্য।

হযরত উমাইমা বিনতে রুকাইকা রা. থেকে বাইয়াত সংক্রান্ত একটি দীর্ঘ হাদীসে আছে যে, নারীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের প্রতি আমাদের নিজেদের চেয়েও মেহেরবান। সুতরাং আপনার হাত মোবারক দিন, আমরা বাইয়াত হই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি নারীদের সাথে হাত মিলাই না। (যা মুখে বলেছি তা মেনে চলাই তোমাদের জন্য অপরিহার্য)।

-মুয়াত্তা মালিক

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর কসম! বাইয়াতের সময় তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) হাত কখনো কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি শুধু মুখে বলতেন, তোমাকে বাইয়াত করলাম।-সহীহ বুখারী ২/১০৭১

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

দুই শ্রেণীর দোযখী এখনও আমি দেখিনি। (কারণ তারা এখন নেই, ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করবে) এক শ্রেণী হচ্ছে ঐ সকল মানুষ, যাদের হাতে ষাঁড়ের লেজের মতো চাবুক থাকবে, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী হচ্ছে) ঐ সকল নারী, যারা হবে পোশাক পরিহিতা, নগ্ন, আকৃষ্ট ও আকৃষ্টকারী; তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়। এরা জান্নাতে যাবে না এবং জান্নাতের খুশবুও পাবে না অথচ জান্নাতের খুশবু তো এত এত দূর থেকে পাওয়া যাবে।

-মুসলিম ২/২০৫, হাদীস : ২১২৮

এই হাদীসে বেপর্দা নারীদের প্রতি কঠিন হুঁশিয়ারি শোনানো হয়েছে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর আগেই তাওবা করে পর্দার বিধানের দিকে ফিরে আসা কর্তব্য।

উপরের আলোচনা থেকে জানা গেল যে, কুরআন মজীদে ও হাদীস শরীফে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে। এই বিধান মেনে চলা সকল ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য অপরিহার্য। এবার ঐ সকল নিকটাত্মীয়দের কথা উল্লেখ করছি, যাদের মাঝে পর্দার হুকুম নেই। এরা ছাড়া অন্য সকলের সাথেই পর্দা করতে হবে।

যাদের সাথে পর্দা নেই

মাহরাম পুরুষের সাথে নারীর পর্দা নেই। মাহরাম পুরুষ দ্বারা উদ্দেশ্য হল এমন পুরুষ আত্মীয়, যার সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-পিতা, ভাই ইত্যাদি।

আর যে পুরুষের সাথে বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর বোন বা এমন নারীর বিবাহে থাকা, যাদের দু’জনকে বিবাহসূত্রে একত্র করা জায়েয নয়) দূর হওয়ার পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম। তার সাথে পর্দা করা ফরয।

পুরুষের জন্য মাহরাম ও গায়র-মাহরাম নারী

একজন পুরুষের মাহরাম নারী হল এমন নারী, যার সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে কোনো অবস্থায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয নয়। যেমন-মা, মেয়ে ইত্যাদি।

পক্ষান্তরে যে নারীর সাথে তার বর্তমানে কিংবা ভবিষ্যতে সাময়িক প্রতিবন্ধকতা (যেমন-নারীর অন্য পুরুষের বিবাহে থাকা) দূর হওয়ার পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েয সে হল গায়র-মাহরাম।

মাহরামের প্রকারভেদ

সাধারণত তিন ধরনের সম্পর্ককে শরীয়ত মাহরাম হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছে।

যথা : ক) বংশীয়/ঔরসজাত সম্পর্ক। খ) দুধ সম্পর্ক ও গ) বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত সম্পর্কের কারণে মাহরাম নারীর বংশ সম্পর্কিত মাহরাম পুরুষগণ হলেন-১. পিতা, দাদা-নানা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ। ২. পুত্র, পৌত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৩. ভাই-সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয়। ৪. ভ্রাতুষ্পুত্র ও তদস্তন পুরুষ। ৫. ভাগ্নে (সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের ছেলে)। ৬. চাচা।

৭. মামা।

আল্লাহ তাআলার বাণী-

ولا يبدين زينتهن الا لبعولتهن او ابآئهن او ابآء بعولتهن او ابنآئهن او ابنآء بعولتهن او اخوانهن او بنى اخوانهن او بنى اخوتهن او نسائهن او ما ملكت ايمانهن او التبعين غير اولى الاربة من الرجال او الطفط الذين لم يظهروا على عورت النساء

(তরজমা) তারা যেন নিজেদের আভরণ প্রকাশ না করে তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যারা যৌন কামনা-রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো নিকট। (সূরা নূর (২৪) : ৩১)

পুরুষের বংশ সম্পর্কিত মাহরাম নারীগণ হলেন-

১. মা ২. কন্যা ৩. ভগ্নী ৪. ফুফু, ৫. খালা ৬. ভ্রাতুষ্পুত্রী ৭. ভাগ্নী।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

حرمت عليكم امهتكم وبنتكم واخوتكم وعمتكم وخلتكم وبنت الاخ وبنت الاخت.

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, ভগ্নী, ফুফু, খালা, ভ্রাতুষ্পুত্রী, ভাগ্নী। … (সূরা নিসা (৪) : ২৩)

দুধ সম্পর্কের কারণে মাহরাম দুগ্ধপানের কারণেও মাহরাম সাব্যস্ত হয়ে থাকে। দুধ মা, দুধ কন্যা, দুধ বোন ইত্যাদি নারীগণ পুরুষের মাহরাম পরিগণিত হবেন। অনুরূপভাবে দুধ পিতা, দাদা ও তদোর্ধ্ব পুরুষ, দুধ পুত্র ও তদস্তন পুরুষ, দুধ ভাই ইত্যাদি পুরুষ নারীর মাহরাম হিসেবে গণ্য হবেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

حرمت عليكم امهتكم … وامهتكم التى ارضعنكم واخوتكم من الرضاعة

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা … দুধ-মা, দুধ বোন। … (সূরা নিসা : (৪) : ২৩)

বিখ্যাত মুফাসসির আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-

একজন নারী যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করায় তাহলে সে দুগ্ধ পানকারীর জন্য হারাম হয়ে যায়। কারণ সে তার মা। তেমনি দুধমার মেয়ে, বোন হওয়ার কারণে; দুধমার বোন, খালা হওয়ার কারণে; দুধমার মা, নানী হওয়ার কারণে; দুধমার স্বামীর অন্য পক্ষের কন্যা, বোন হওয়ার কারণে; স্বামীর বোন, ফুফু হওয়ার কারণে; স্বামীর মা, দাদী হওয়ার কারণে ঐ শিশুর জন্য হারাম হয়ে যায়। তেমনি দুধমার ছেলে-মেয়ের সন্তানাদিও হারাম হয়ে যায়। কারণ তারা তার ভাই-বোনের

সন্তানাদি। (তাফসীরে কুরতুবী ৫/৭২)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন, আবুল কুয়াইসের ভাই আফলাহ (যিনি আয়েশা রা.-এর দুধ চাচা) একবার আমার নিকট আসার অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালাম। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসার পর তাঁকে ঘটনাটি জানালাম। তিনি আমাকে অনুমতি প্রদানের আদেশ করলেন।

মুসলিমের রেওয়ায়েত অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার সাথে পর্দা করো না। কেননা, বংশীয় সম্পর্কের দ্বারা যা হারাম হয়, দুধ সম্পর্ক দ্বারাও তা হারাম হয়।

-সহীহ বুখারী ৮/৩৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৪৪৪; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৪৭; সুনানে নাসায়ী ৬/৯৯

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে মাহরাম

মাহরাম সাব্যস্ত হওয়ার তৃতীয় কারণ হল বিবাহ। বৈবাহিক সম্পর্কের দ্বারাও নারী-পুরুষ একে অপরের মাহরাম সাব্যস্ত হয়। নারীর বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম পুরুষ হল স্বামীর পিতা (শ্বশুর), স্বামীর অন্য পক্ষের পুত্র ইত্যাদি। তেমনিভাবে নিজের শাশুড়ি, স্ত্রীর গর্ভজাত অন্য পক্ষের কন্যা ইত্যাদি নারীও পুরুষের জন্য মাহরাম গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وحرمت عليكم امهتكم … وامهت نسائكم وربآئبكم التى فى حجوركم من نسائكم التى دخلتم بهن …

(তরজমা) তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, … শাশুড়ি ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের সাথে সংগত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসে তার গর্ভজাত কন্যা, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে।… (সূরা নিসা : ২৩)

ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ কুরতুবী রাহ. বলেন-বিবাহ সম্পর্কীয় মাহরাম নারী চার প্রকার : ১. স্ত্রীর মা (শাশুড়ি) ২. স্ত্রীর কন্যা ৩. পিতার স্ত্রী (সহোদর মা, সৎ মা) ও ৪. পুত্রবধু। (তাফসীরে কুরতুবী ২/৭৪)

উল্লেখ্য, শাশুড়ি বলতে স্ত্রীর মা, দাদী-নানী এভাবে উপরের দিকের সকলকে বোঝাবে। তবে স্ত্রীর খালা, ফুফু অর্থাৎ খালা শাশুড়ি, ফুফু-শাশুড়ি মাহরাম নয়। এঁদের সাথে পর্দা আছে। একই কথা নারীর ক্ষেত্রে। স্বামীর পিতা, দাদা ও নানার সাথে পর্দা নেই। তবে স্বামীর চাচা, মামা অর্থাৎ চাচা-শ্বশুর, মামা-শ্বশুরের সাথে পর্দা আছে।

উপরের আলোচনা থেকে পর্দার বিধান পালন সম্পর্কে আমরা যা পেয়েছি তা হচ্ছে-

এক. পর্দার বিধান পালন করার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালন করা, যা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলার ইরশাদ-

وما كان لمؤمن ولا مؤمنة اذا قضى الله ورسوله امرا ان يكون لهم الخيرة من امر

(তরজমা) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অবকাশ থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টতই পথভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৬)

দুই. পর্দার বিধান মেনে চলা হচ্ছে ঈমানের দাবি। কেননা আল্লাহ তাআলা পর্দা-বিধানের ক্ষেত্রে শুধু ঈমানদার নারীপুরুষকেই সম্বোধন করেছেন।

তামীম গোত্রের কয়েকজন নারী উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আগমন করল, যাদের পরনে ছিল পাতলা কাপড়। উম্মুল মুমিনীন তাদেরকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘তোমরা যদি মুমিন নারী হও তাহলে এ তো মুমিন নারীর পোশাক নয়। আর যদি মুমিন না হও তাহলে তা ব্যবহার করতে পার।’ (মাআলিমুস সুনান ৪/৩৭৬)

এক নববধুকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকট আনা হল, যার পরনে ছিল রঙ্গিন কিবতী চাদর। তখন উম্মুল মুমিনীন রা. বললেন, ‘যে নারী এ রকম পোশাক পরিধান করে তার তো সূরা নূরের প্রতি ঈমান নেই।’ (তাফসীরে কুরতুবী ১৪/২৪৪)

তিন. পর্দাপালন হল সতর।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক লাজুক ও পর্দাশীল। তিনি লজ্জা ও পর্দাকে পছন্দ করেন।

(আবু দাউদ, হাদীস : ৪০১২, ৪০১৩; সুনানে নাসাঈ ১/২০০; মুসনাদে আহমদ ৪/২২৪

আল্লাহ তাআলা পিতা আদম ও হওয়া আ.-এর প্রতি পর্দার নেয়ামতকে বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

ان لك الا تجوع فيها ولاتعرى

(তরজমা) তোমার জন্য এ-ই রইল যে, তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্তও হবে না এবং নগ্নও হবে না।-সূরা ত্বহা (২০) : ১১৮)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বর্ণনা করে ইরশাদ করেছেন-

يبنى ءادم قد انزلنا عليكم لباسا يورى سوءتكم وريشا ولباس التقوى ذلك خير.

(তরজমা) হে বনী আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার ও বেশ-ভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার পরিচ্ছদ এটাই সর্বোৎকৃষ্ট।- সূরা আ’রাফ (৭) : ২৬)

চার. পর্দা হল নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতার উপায়। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তা ঘোষণা করেছেন।

পাঁচ. পর্দা হল ইফফাত তথা চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উপায়। এই ইফফত ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুআর অংশ। তিনি দুআ করতেন-

أسألك الهدى والتقى والعفة

অন্য রেওয়ায়েতে

إني أسألك الهدى والتقى والعفاف

অর্থ : (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করছি হেদায়েত, তাকওয়া ও ইফফত (চারিত্রিক পবিত্রতা)।

-সহীহ মুসলিম (কিতাবুয যিকর; জামে তিরমিযী (দাওয়াত অধ্যায়); ইবনে মাজাহ (দুআ অধ্যায়); মুসনাদে আহমদ ১/৪১১, ৪১৬ ও ৪৩৬

এই পবিত্রতা হচ্ছে জান্নাতী নারীদের একটি গুণ। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে এর দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা তাদের অসাধারণ রূপের বর্ণনা দেওয়ার সাথে সাথে একথাও বলেছেন যে, তারা নির্ধারিত গৃহে অবস্থান করবে এবং নিজ স্বামী ছাড়া অন্যের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। তো তাদের সৌন্দর্যের পাশপাশি তাদের পবিত্রতারও প্রশংসা করেছেন। সুতরাং রূপ-সৌন্দর্যের সাথে যদি ইফফাত ও সতীত্ব থাকে তবে এরচেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?!! আর পর্দাই হল সতীত্ব রক্ষার উপায়।

আল্লাহ আমাদেরকে পর্দার বিধান মেনে চলার তাওফিক দিক।আমিন।

সূত্রঃ সংগৃহিত

মুসলমান হলে জেনে নিন – ‘চলন্ত ট্রেনে নামাজ আদায়ের পদ্ধতি’ ।

যেহেতু আমাদের দেশের বেশিরভাগ রেললাইন মিটার গেজ- তাই ট্রেন চলার সময় বেশি ঝাঁকুনি দেয়, ফলে ট্রেন চলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া অনেকের জন্য মুশকিলের কারণ হয়। কারণ ট্রেনের ঝাঁকুনির দরুণ পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ ছাড়া নামাজ অবস্থায় ট্রেন দিক পরিবর্তন করলে কেবলা ঠিক রাখা যায় না। এমতাবস্থায় অনেকেই নামাজ আদায় নিয়ে খুব চিন্তিত থাকেন।

উল্লেখিত সমস্যার ক্ষেত্রে ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, সম্ভব হলে ফরজ নামাজ দাঁড়িয়ে আদায় করা ফরজ। তাই ট্রেনেও ভ্রমণকালে যথাসম্ভব দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করবে।

প্রয়োজনে কিছু ধরেও দাঁড়াতে পারবে। অবশ্য যদি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া সম্ভব না হয়- তবে সেক্ষেত্রে বসে নামাজ পড়তে পারবে।
আর ট্রেনেও নামাজ শুরু করার সময় কেবলার দিক নিশ্চিত করে সেদিকে ফিরে নামাজ পড়তে হবে। অতপর নামাজ অবস্থায় ট্রেন ঘুরে যাওয়ার কারণে কেবলার দিক পরিবর্তন হয়ে গেলে নামাজি তা বুঝামাত্র কেবলার দিকে ঘুরে যাবে। কেবলার দিক পরিবর্তন হয়ে গেছে জানা সত্ত্বেও নামাজে কেবলার দিকে না ঘুরলে ওই নামাজ পুনরায় পড়ে নিতে হবে।
তবে শুরুতে কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ানোর পর নামাজের ভিতর কেবলা পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে না পারার কারণে যদি ওইভাবেই নামাজ শেষ করে; তবে তার নামাজ আদায় হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, চলন্ত ট্রেনে ওই সময় নামাজে দাঁড়ানো উচিত যখন ট্রেনটি একদিকে চলতে থাকে তাহলে নামাজের ভিতর কেবলা পরিবর্তন করতে হবে না।

ইসলাম কি বলছে -‘মহিলাদের গোঁফ-দাড়ী হলে তা পরিষ্কার করা যাবে কি না’..?-জেনে নিন

প্রশ্ন : মহিলাদের চেহারার লোম পরিষ্কার করা বৈধ
কি না…?
**************************
উত্তরঃ মহিলাদের জন্য মুখমন্ডলের লোম পরিষ্কার
করা জায়েয। তবে তা উপড়ে ফেলা উচিৎ নয়।
কেননা এতে শারীরিক কষ্ট হয়ে থাকে, তাই
পাউডার জাতীয় (হেয়ার রিমোভার) বস্তু দ্বারা
পরিষ্কার করা শ্রেয়।

প্রশ্ন : মহিলাদের গোঁফ-দাড়ী হলে তা পরিষ্কার
করা যাবে কি না…………???
*************************
উত্তর : যদি কোন মহিলার মুখে গোঁফ-দাড়ী
গজায়, তাহলে তা পরিষ্কার করা শুধু জায়েযই নয় বরং
অতি উত্তম। যেহেতু উপড়াতে কষ্ট হয় তাই তা না
করে কোনো প্রকার পাউডার দ্বারা পরিষ্কার করা
উচিত। তদ্রুপ যদি কোনো মহিলার ঠোঁটের উপর
লোম গজায় তাহলে তা পরিষ্কার করা নিষেধ নয়। বরং
তা পরিষ্কার করা মহিলাদের জন্য উত্তম ও মুস্তাহাব।

প্রশ্ন : মহিলারা হাত পায়ের লোম পরিষ্কার করতে
পারবে কি না……….???
***********************
উত্তরঃ মহিলাদের জন্য হাত ও পায়ের লোম
পরিষ্কার করা জায়েয। কেননা তাদের জন্য লোম না
হওয়াই সৌন্দর্য। আর যেহেতু তাদের মূলই হচ্ছে
লোম না থাকা, তাই এতে সৃষ্টির মধ্যে কোনো
প্রকার পরিবর্তন বলা যাবে না। এবং এ ক্ষেত্রে
ধোকা দেয়ারও অর্থ বুঝায়না। সুতরাং হাত পায়ের
লোম পরিষ্কার করতে পারবে।
# ফতুয়ায়ে আলমগীরি প্রথম খন্ড :৫৬৮ পৃষ্ঠা।

কোরআন ও হাদীসের আলোকে জেনে নিন কবর জিয়ারত এর সঠিক বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত…!!

পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

ইসলামের সূচনালগ্নে যখন মানুষ কবর পূজা করত তখন আল্লাহর নবী সা. কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। সুনানে ইবনে মাজাহ শরিফের ১৫৭১ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আমি তোমাদের কবর-যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। (এখন ঐ নিষেধাজ্ঞা মানসূখ করা হচ্ছে) এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার। কারণ তা দুনিয়ার মোহ দূর করে এবং আখিরাতকে মনে করিয়ে দেয়। (মিশকাত পৃ ১৫৪)

এরপর ইসলাম আসার পর সাহাবায়ে কেরাম যখন জাহিলিয়্যাতের রীতিনীতি ভুলে যান তখন রাসুল সা. আবার কবর যেয়ারতের অনুমতি প্রদান করেন। কারণ কবরের দৃশ্য দেখে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের বিশ্বাস তাজা হয়, নিজের মৃত্যু ও কবর-জীবনকে স্মরণ করে আখিরাতের প্রস্তুতির সংকল্প গ্রহণ করা যায়।

প্রশ্ন ১ – কবর দৃষ্টিগোচর হলে বা কবরের দেয়াল অতিক্রম করলে কবরবাসীদেরকে সালাম করতে হবে কি?
উত্তর – পথিক হলেও সালাম দেয়া উত্তম, এরূপ ব্যক্তির যিয়ারতের নিয়ত করে নেয়া উত্তম।

প্রশ্ন ২ – যিয়ারতকারীর নির্দিষ্ট কবরের পাশে গিয়ে যিয়ারত করার হুকুম কি?
উত্তর – গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ করাই যথেষ্ট, তবুও যদি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দো‘আ ও সালাম করতে চায় করতে পারবে।

প্রশ্ন ৩ – মৃত ব্যক্তি যিয়ারতকারীকে চিনতে পারে?
উত্তর – কতিপয় হাদিসে এসেছে যে, যিয়ারতকারী যদি এমন হয় যে দুনিয়াতে তার সাথে পরিচয় ছিল তাহলে আল্লাহ যিয়ারতকারীর সালামের উত্তর দেয়ার জন্য তার রুহ ফিরিয়ে দেন । কিন্তু এ হাদিসের সনদে কিছু ত্রুটি রয়েছে। অবশ্য আল্লামা ইবনে আব্দুল বার রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

প্রশ্ন ৪ – উম্মে আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত,
«نهينا عن اتباع الجنائز ولم يعزم علينا»
“আমাদেরকে জানাযার সাথে চলতে নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি”। হাদিসটির ব্যাখ্যা কি?

উত্তর – আবস্থা দৃষ্টে প্রতিয়মান হচ্ছে যে, বর্ণনাকারীর মতে নিষেধটি কঠোর নয়, তবে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে প্রত্যেক নিষেধ হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।

«ما نهيتكم عنه فاجتنبوه وما أمرتكم به فأتوا منه ما استطعتم» (متفق عليه)

“আমি যার থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তোমরা তা পরিত্যাগ কর, আর আমি তোমাদেরকে যার আদেশ দেই, তোমরা তা সাধ্যানুসারে পালন কর”। (বুখারি ৩৯১)

এ হাদিস দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, মহিলাদের জানাযার সাথে কবর পর্যন্ত যাওয়া হারাম, তবে পুরুষদের ন্যায় তারা জানাযায় অংশ গ্রহণ করতে পারবে।

প্রশ্ন ৫ – একটি হাদিসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তিকে কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটতে দেখে বললেন, হে জুতা ওয়ালা! তোমার জুতাদ্বয় খুলে নাও। এ হাদিসের উপর কি আমল করা যাবে? জুতা নিয়ে কেউ কবরের উপর হাটা-চলা করতে চাইলে তাকে কি নিষেধ করা হবে?

উত্তর – হ্যাঁ, বর্ণিত হাদিসের উপর আমল করা যাবে, সুতরাং কোন অবস্থাতেই কবরের উপর জুতা নিয়ে হাটা-চলা করা জায়েয হবে না। হ্যাঁ, বিশেষ প্রয়োজনে যেমন কবরের উপর যদি কাঁটাদার গাছ থাকে বা মাটি অত্যন্ত গরম হয়, যে কারণে খালিপায়ে চলা অসম্ভব হয়, এমতাবস্থায় জুতা নিয়ে কবরের উপর হাঁটা যেতে পারে, এরূপ কোন বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাকে অবশ্যই নিষেধ করা হবে, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। তাকে শরি‘আতের হুকুম জানিয়ে দেবে।

প্রশ্ন ৬ – গোরস্থানে প্রবেশকালে জুতা খুলার বিধান কি?
উত্তর – কবরের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে জুতা অবশ্যই খুলতে হবে, আর যদি কবরের উপর দিয়ে না হেটে গোরস্থানের প্রথম কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়, তা হলে জুতা খুলতে হবে না।

প্রশ্ন ৭ – জনৈক মহিলাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কবরের পাশে ক্রন্দরত আবস্থায় দেখে বলেছিলেন,
«اتقي الله واصبري»
“আল্লাহকে ভয়কর ও ধৈর্যধারণ কর”। (বুখারি ও মুসলিম) এ হাদিস কি মহিলাদের কবর যিয়ারত বৈধ প্রমাণ করে না?

উত্তর – সম্ভবত উল্লিখিত ঘটনাটি নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য কবর যিয়ারত বৈধ থাকাকালিন সময়ের ঘটনা। আর মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষিদ্ধকারী হাদিস এ হাদিসের জন্যে নাসেখ বা এ হাদিসকে রহিতকারী।

প্রশ্ন ৮ – কিছু কিছু শহরে অনেক মানুষ কববের উপর ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

উত্তর – এটা নেহায়েত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ, এ কাজের দ্বারা কবরবাসীদের অপমান করা হয়, তাই তাদেরকে এ কাজ হতে বারণ করা এবং শরি‘আতের বিধান সম্পর্কে অবহিত করা জরুরী। তারা এসব কবরের উপর যেসব সালাত আদায় করেছে, তা সব বাতিল ও বৃথা। এ অবস্থায় কবরের উপর বসাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বলেছেন,

« لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها » (رواه مسلم)

“কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না”। (মুসলিম ২১২২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লম আরো বলেছেন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (رواه البخاري)

“আল্লাহ ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর লানত করেছেন, কারণ তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (মুসলিম ১০৭৯)

এ হাদিস সম্পর্কে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বাণী দ্বারা তাদেরকে তাদের গর্হিত কাজের জন্য সতর্ক করেছেন।
প্রশ্ন ৯ – জনৈক ব্যক্তির কবরের উপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হল, আর ঐ ব্রিজের উপর দিয়ে একটি যাত্রিবাহী গাড়ি যাওয়ার সময় বিরত দিল, যাত্রীদের মাঝে একজন মহিলাও রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গাড়িটির যাত্রা বিরতির কারণে সে মহিলা কি কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে, সে মহিলা কি কবরবাসীদের সালাম করবে?

উত্তর – না, মহিলা কবর যিয়ারতকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না, ব্রিজ কেন কবরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও কবর যিয়ারতকারী বলে গণ্য হবে না। মহিলা যদি পথচারী হয়, তবুও তার পক্ষে কবরবাসীদের সালাম না করা উত্তম।
প্রশ্ন ১০ – একটি হাদিস প্রচলিত আছে,
« اذا مررتم بقبر كافر فبشروه بالنار »
“যখন তোমরা কোন কাফেরের কবরের পাশ দিয়ে যাও, তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও”। এ হাদিসটি কতটুকু শুদ্ধ?
উত্তর – আমার জানা মতে এ হাদিসের বিশুদ্ধ কোন সনদ নেই।

প্রশ্ন ১১- মহিলারা কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম দেবে কি?
উত্তর – আমার জানা মতে কবরবাসীদেরকে মহিলাদের সালাম না-করা উচিৎ। কারণ সালাম বিনিময় কবর যিয়ারতের রাস্তা উম্মুক্ত করবে, দ্বিতীয়ত সালাম দেয়া কবর জিয়ারতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মহিলাদের উপর ওয়াজি হচ্ছে সালাম বর্জন করা, তারা যিয়ারত ব্যতীত মৃতদের জন্য শুধু দো‘আ করবে।
প্রশ্ন ১২ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের নিয়ম কি?
উত্তর – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের সুন্নত তরিকা এই যে, কবরের দিকে মুখ করে সালাম দেবে, অতঃপর তাঁর দু’সাথী আবু-বকর ও ওমরকে সালাম দেবে, অতঃপর ইচ্ছা করলে অন্য জায়গায় গিয়ে কিবলামুখী হয়ে নিজের জন্য দো‘আ করবে।
প্রশ্ন ১৩ – মহিলাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?
উত্তর – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করা নিষেধ, যেসব হাদিসে মহিলাদের কবর যিয়ারত থেকে বারণ করা হয়েছে, সেখানে রাসূলের কবরও অন্তর্ভুক্ত, তাই তাদের জন্য জরুরী হচ্ছে রাসূলের কবর যিয়ারত না-করা। মহিলাদের জন্য রাসূলের কবর যিয়ারত বৈধ না অবৈধ এ সম্পর্কে ওলামায়ে কেরাম দু’ভাগে বিভক্ত, তাই সুন্নতের অনুসরণ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য মহিলাদের জন্য যে কোন কবর যিয়ারত ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। তা ছাড়া মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ সংক্রান্ত হাদিসে রাসূলের কবরকে বাদ দেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় হাদিসের ব্যাপকতার উপর আমল করাই ওয়াজিব, যতক্ষণ না এর বিপরীত কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ১৪ – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?
উত্তর – মসজিদে প্রবেশকালে রাসূলকে শুধু সালাম করবে, শুধু কবর জিয়াতর উদ্দেশ্যে যাবে না, তবে মাঝে-সাজে যেতে পারে।
প্রশ্ন ১৫ – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা কি জায়েয?

উত্তর – মসজিদে নববি জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয। তাই মসজিদে নববির যিয়ারত মূল উদ্দেশ্য করে সফর করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে নবীর কবর যিয়ারত করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لاتشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد: المسجد الحرام ومسجدي هذا والمسجد الاقصى» (رواه البخاري)

“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা যাবে নাঃ মাসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদে আকসা”। (বুখারি ২৮১)

প্রশ্ন ১৬ – কবর জিয়ারতের জন্য জুমার দিনকে নির্দিষ্ট করা কেমন?

উত্তর – এর কোন ভিত্তি নেই। যিয়ারতকারী সুযোগ বুঝে যখন ইচ্ছা যিয়ারত করবে। জিয়ারতের জন্য কোন দিন বা রাতকে নির্ধারিত করা বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«من احدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد» (متفق عليه)
“আমাদের এ দ্বীনে যে কেউ নতুন কিছু আবিষ্কার করল, তা পরিত্যক্ত”। (বুখারি ৮৬১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

«من عمل عملا ليس عيه أمرنا فهو رد» (رواه مسلم)

“যে এমন কোন কাজ করল যা আমাদের আদর্শ নয়, তা পরিত্যক্ত”।হাদিসটি ইমাম মুসলিম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
প্রশ্ন ১৭ – মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিভাবে কবর জিয়ারতের দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন?
উত্তর – কবর যিয়ারত প্রথমে সবার জন্য নিষেধ ছিল, অতঃপর সবার জন্য জায়েয হয়, অতঃপর শুধু মহিলাদের জন্য নিষেধ হয়। এ ব্যাখ্যার পরিপেক্ষিতে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আহাকে কবর জিয়ারতের আদব তখন শিক্ষা দিয়েছিলেন যখন তা সবার জন্য জায়েয ছিল।
প্রশ্ন ১৮ – কবরের পাশে দো‘আ কি দু’হাত তুলে করতে হবে?
উত্তর – কবরের পাশে দু’হাত তুলে দো‘আ করা জায়েয আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে কবরবাসীদের জন্য দু’হাত তুলে দো‘আ করেছেন। (মুসলিম)
প্রশ্ন ১৯ – কবরের পাশে সম্মিলিত দোয়ার কি হুকুম?
উত্তর – কাউকে দো‘আ করতে দেখে শ্রোতাদের আমিন আমিন বলায় কোন বাঁধা নেই। তবে পরিকল্পিতভাবে সম্মিলিত দো‘আ করা যাবে না। অকস্মাৎ কাউকে দো‘আ করতে দেখে তার সাথে সাথে আমিন আমিন বলা যাবে, কারণ এটাকে সম্মিলিত দো‘আ বলা হয় না।
প্রশ্ন ২০ – গোরস্থানের প্রথমাংশে সালাম দিলে সমস্ত কবরবাসীর জন্য সালাম বিবেচ্য হবে?
উত্তর – এ সালামই যথেষ্ট, সে ইনশাল্লাহ জিয়ারতের সাওয়াব পেয়ে যাবে। যদি গোরস্থান অনেক বড় হয় আর সে ঘুরে ঘুরে সব দিক দিয়ে সালাম বিনিময় করতে চায় তাও করতে পারবে।
প্রশ্ন ২১ – অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা কি জায়েয?
উত্তর – শিক্ষা গ্রহণের জন্য হলে অমুসলিমের কবর যিয়ারত করা জায়েয। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করে তাঁর জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁকে এ বিষয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি। শুধু জিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ২২ – দু’ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করার কোন ভিত্তি আছে কি?
উত্তর – আমার জানামতে এর কোন ভিত্তি নেই, যিয়ারতকারীর যখন সুযোগ হবে তখন সে যিয়ারত করবে, এটাই সুন্নত।
প্রশ্ন ২৩ – মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কবর মুখী হয়ে দো‘আ করা কি নিষেধ?
উত্তর – না, নিষেধ নয়, মৃতের জন্য দো‘আ করার সময় কেবলামুখী ও কবরমুখী উভয় বৈধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির দাফন শেষে বললেন,

«استغفروا لأخيكم واسألوا له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রর্থনা কর এবং তার ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কেননা তাকে এখন প্রশ্ন করা হবে”।

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা বলেননি যে, কিবলামুখী হয়ে দো‘আ কর।

সুতরাং কিবলামুখী হয়ে দো‘আ করুক আর কবরমুখী হয়ে দো‘আ করুক উভয়ই জায়েয। রাসূলের সাহাবিগণ কবরের চতুর্পাশে দাঁড়িয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করতেন।
প্রশ্ন ২৪- দু’হাত তুলে মৃতের জন্য দো‘আ করা কি জায়েয?
উত্তর – কিছু কিছু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কবর যিয়ারত করে দো‘আ করতেন তখন দু’হাত তুলেই দো‘আ করতেন। যেমন ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করে তাদের জন্য দো‘আ করার সময় দু’হাত তুলেছেন।
প্রশ্ন ২৫ – আমাদের এখানে কিছু সৎকর্মী যুবক বাস করে, তারা নিজেদের সাথে কতক গাফেল লোকদেরকে কবর জিয়ারতের জন্য নিয়ে যেতে চায়, হয়ত তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় সঞ্চার হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের মত কি?

উত্তর – এটা একটি মহৎ কাজ, এতে কোন বাঁধা নেই। এটা ভাল কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
প্রশ্ন ২৬ – কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করার হুকুম কি?
উত্তর – লিখা বা নাম্বারিং করা ব্যতীত শুধু পরিচয়ের জন্য কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করা যেতে পারে। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের উপর কিছু লিখতে নিষেধ করেছেন, আর নাম্বারিং করাও লিখার অন্তর্ভূক্ত। তবে কবরস্থ লোকের পরিচয়ের জন্য শুধু পাথর ইত্যাদি রাখা যাবে, কালো বা হলুদ রঙের পাথরও রাখা যাবে। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি উসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।

ইসলাম কি বলছে – টিভি দেখা জায়েয না হারাম ??- জেনে নিন

ইসলাম কি বলছে – টিভি দেখা জায়েয না হারাম ??- জেনে নিন

আমাদের দেশে এক শ্রেণীর আলেম আছেন, যাদের সৃষ্টিতে টিভি হারাম। চাই ইসলামী হোক কিংবা অনৈসলামী। এবার দেশে ছুটিতে গিয়ে কাদিয়ানীর চেলা বরকতুল্লাহর তনয় হাবীবুল্লাহ ভণ্ড নবুওতদাবীদারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভায় বক্তৃতা করছিলাম।

কথা প্রসঙ্গে টিভিতে কাদিয়ানীদের প্রচার সম্পর্কে বলেছিলাম; যে তারা বিশ্বের অনেক ভাষায় সরাসরি তাদের দাওয়াত প্রচার করছে। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আলোচনা সংক্ষেপ করতে বলা হলো। উপস্থিত জনতা হতে আওয়াজ আসা শুরু হলো যে, হুজুর টিভির ওয়াজ বন্ধ করুন। আমি আমার আলোচনা যথা সময়ে শেষ করলাম। আমাকে ভিতরে ডাকা হলো, সকলে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললো, আপনি তো আজ টিভি দেখা জায়েয করে দিলেন! আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, এবং বললাম: আমি টিভি হালাল করতে যাবো কেন? টিভি তো আগ থেকেই হালাল। এই জবাব শুনে সকলে এক সঙ্গে বলা শুরু করলো, আপনি বলেন কি! টিভি দেখা হারাম, আমরা এই ফতোয়াই দিয়ে আসছি।

তখন আমি বললাম,আপনাদের এই ফতোয়া শুনে কয়জন লোক টিভি দেখা ত্যাগ করেছে? এবং কয়টি বাড়ি দেখাতে পারবেন যে, টিভি নাই? অথচ গ্রামের প্রতিটা ঘরে এখন স্যাটালাইট টিভির লাইন রয়েছে।

আমি তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম,যে এই যুগটা মিডিয়ার যুগ, তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। আমাদেরকেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দাওয়াতী কাজে ভূমিকা রাখতে হবে।

স্থানীয় এক শাইখুল হাদীস ও মুফতী বললেন, ২৫টি দলীলের ভিত্তিতে টিভি দেখা হারাম।

আমি বললাম, দুই একটা দলীল পেশ করুন। তিনি বললেন, দেখুন টিভিতে উপস্থাপনা মহিলারা করে থাকে, তাই হারাম। এই দলীল শুনে হাসবো না কাঁদবো, বললাম অনেক টিভি চ্যানেল এমন আছে, যার উপস্থাপক পুরুষ। মহিলাদের সেখানে কোন সুযোগ নাই। তখন তিনি বললেন, এমন হতেই পারে না। বললাম, হতে পারে। ক্বানাতে মাজদ, ( সৌদী আরব, ক্বানাতে রিসালা, কুয়েত, তাছাড়া ক্বানাত ইক্বরা, এছাড়াও মধ্যপ্রচ্যের সব দেশেই এমন চ্যানেল রয়েছে, যেগুলোতে ইসলামী আলোচনা, কুরআন তেলাওয়াত, হাদীসে রাসূলের আলোচনা হয়ে থাকে। আমার একথা শুনে শায়খ বললেন, যে তবুও হারাম। আমি বললাম এগুলোতে তো আর মহিলারা উপস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে না। তিনি বললেন, টিভির আবিষ্কারকরা অমুসলিম, তাই টিভি দেখার হারাম। (এটা তার দ্বিতীয় দলীল) আমি বললাম, মাশা আল্লাহ! আজব দলীল পেশ করলেন। এটা যদি হারাম হওয়ার দলীল হয়, তাহলে তো আজ আর এখান থেকে বাড়িতেই যেতে পারবনে না! কারণ, যে গাড়িতে চড়ে বাসায় যাবেন, তাও তো অমুসলিমদের আবিষ্কার, আপনার হাতের মোবাইল সেটটি অমুসলিমদের আবিষ্কার, আপনি হজ্জ করতে সৌদী আরব গিয়েছিলেন, প্যালেনে চড়ে তাও অমুসলিমদের আবিষ্কার, এই দলীলে যদি টিভি দেখা হারাম হয়, তাহলে তো আপনার হজ্জ হয় নাই, বাড়িতে যাওয়া হারাম হবে, মোবাইল ফোন রাখতে পারবেন না।

তাদের সবগুলো দলীল এমন খোড়া যা একজন সাধারণ গবেষক জবাব দিতে পারবেন। কুরআন ও হাদীস হতে একটি দলীলও দিতে পারেন নি। আরো কত কথা। আমার ইমেইজ বিলীন করে দিলাম, কারণ আমি টিভির পক্ষে কেন কথা বললাম। জনগণ আমার কোন কথাই আর শুনবে না। আমি বললাম, আপনাদের এমন ফতোয়ায় কি কোন বাড়ি টিভি ছাড়া হয়েছে, মোবাইল ছাড়া কোন লোক দেখাতে পারবেন। আপনার নিজের হাতেও অমুসলিমদের তৈরী হারাম মোবাইল রয়েছে।

একসময় এই শ্রেণীর আলেমরা ইংরেজি পড়া হারাম ফতোয়া দিয়েছিলেন। এখন অবশ্য তাড়াও ইংরেজি পড়ান।

হক্কানী ওলামেয় কেরামগণ যদি এমন ফতোয়া না দিয়ে ইসলাম প্রচারের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতো, তাহলে ইসলামের সঠিক কথাগুলো বিশ্বব্যাপী সহজে পৌঁছে যেতো। বর্তমানে বাংলাদেশের কয়েকটি টিভিতে ইসলামী আলোচনা হয়, তাদের মধ্য হতে কিছু কিছু চ্যানেলে বেদআতী আলেমগণ অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু চ্যানেলে সঠিক কথা-বার্তা প্রচার হচ্ছে।

দেখুন টিভি একটি যন্ত্র, এর মাধ্যমে আপনি যা দেখাতে চাইবেন,তাই সে দেখাবে,এক কথায় টিভি আয়নার মতো,আয়নার সামনে যে ছবি ধরা হবে,সে তাই দেখাবে, ছবি সুন্দর না হলে যেমন আয়নাকে দোষারোপ করা যায় না, টিভিতেও খারাপ কিছু দেখালে, টিভিকে খারাপ বলা যুক্তি সঙ্গত হবে না। বরং যিনি পরিচালনা করছেন, তাকেই দোষারোপ করতে হবে। টিভিতে যদি ইসলামী অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়,সেই ক্ষেত্রেও টিভিকে হারাম ফাতাওয়া দেওয়া এক প্রকারের অজ্ঞতা বা গোঁড়ামী।

আমার এই কথাগুলো একটি বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষিতে লেখা, কাউকে হ্যায় করা উদ্দেশ্য নয়, আসুন আমরা প্রচারের যতগুলো প্রযুক্তি রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করে, ইসলামের সঠিক আলো সারা বিশ্বে পৌঁছে দেই। কারণ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং শোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যতদ্রুত সংবাদ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অন্য কোন উপায়ে এত দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব না।

আল্লাহ আমাদের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন